আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণা। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১ এর অন্তর্গত।
Table of Contents
কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণা

কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি কৌশল বা পন্থা যা বলে দেয় যে, প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত মানব সম্পদ পলিসি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সমন্বিত এবং তা প্রয়োগ করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন করা যায়। এটি হলো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে মানব সম্পদ সংগ্রহ, নির্বাচন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের কৌশলগত পন্থা। অর্থাৎ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো মানব সম্পদ সম্পর্কে চারটি কাজের সমষ্টি। যেমন:
i) মানব সম্পদ সংগ্রহ;
ii) মানব সম্পদের উন্নয়ন;
iii) মানব সম্পদ সংরক্ষণ ও
iv) মানব সম্পদের ব্যবহার।
অন্যভাবে বলা যায়, কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অর্থ হলো- প্রতিষ্ঠানের কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানব সম্পদ কার্যক্রমকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করা এবং উক্ত মানব সম্পদ কার্যক্রমের কৌশলসমূহ যেমন- মানব সম্পদ সংগ্রহ, নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও পুরস্কার প্রদান নিশ্চিত করা ।
কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কয়েকটি বিখ্যাত সংজ্ঞা দেওয়া হলো :
হেনড্রি ও পেট্টিগ্রিউ (Hendry and Pettigrew) –
এর মতে, “কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের লোকবলকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে মনে করার সাথে সংশ্লিষ্ট।” (Strategic HRM is concerned with seeing the people of the organization as a strategic resource for the achievement of competitive advantage.)
Schuler and Walker –
এর মতে, “কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো- কতকগুলো প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম যেখানে লোকবল সম্পর্কিত ব্যবসায় সমস্যা সমাধানে মানব সম্পদ ও লাইন ম্যানেজারগণ যৌথভাবে কাজ করে।” (A set of processes and activities jointly shard by human resources and line managers to solve people-related business problems.)
Wright and MeMahar-
এর মতে, “কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো- পরিকল্পিত মানব সম্পদ উন্নয়ন ও কার্যক্রমের ধরন যা প্রতিষ্ঠানকে এর লক্ষ্যার্জনে সক্ষম করে তোলে ।” (The patterns of planned human resources developments and activities intended to enable organization to achieve its goals.)
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়-
i) এটি হলো- মানব সম্পদ নীতি ও প্রয়োগ এবং সমগ্র প্রতিষ্ঠানের-কৌশলগত লক্ষ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মধ্যে সংযোগ ।
ii) এটি হলো প্রতিষ্ঠানের কতকগুলো প্রকল্প যা প্রতিটি মানব সম্পদকে পারস্পরিক সম্পর্কে সম্পর্কিত করে যাতে তারা একে অপরের সমর্থনে কাজ করে।
iii) এটি যোগ্যতাভিত্তিক কার্যসম্পাদন পরিমাপের সাথে মানব সম্পদ কার্যক্রমের সংযোগ সাধনের প্রচেষ্টা।
iv) এটি মানবসম্পদের কার্যক্রমকে ব্যবসায়িক মুনাফার সাথে সম্পর্কিত করার প্রয়াস।
v) এটি কার্যসম্পাদন ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে ।
সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো- মানব সম্পদকে প্রতিষ্ঠানের-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সংযোগ ঘটানো যাতে কার্যসম্পাদন ও প্রতিষ্ঠানের সংহতির উন্নয়ন সাধন হয় যা উদ্ভাবন, পরিবর্তনশীলতা ও তুলনামূলক সুবিধা অর্জনের কাজকে ত্বরান্বিত করে ।
কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অভ্যুদয়ের ইতিহাস
দীর্ঘ সময়ের পথ-পরিক্রমায় মানব সম্পদ কার্যাবলির আবির্ভাব হয়। এটি মূলত এফ,ডব্লিও, টেলরের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও হেনরি ফেয়লের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা তত্ত্বসমূহ প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে মানব সম্পদ প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে কর্মী ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বেড়ে যায়।
এ সময়ে কর্মী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পূর্ণতা লাভ করে এবং শ্রমিক সম্পর্ক ও কর্মী সংস্থাপনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- ভারতের টাটা আয়রন এন্ড স্টিল কোম্পানি (TISCO) ১৯৪৭ সালে প্রথম কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ (personnel management department) চালু করে। নিচে তালিকার মাধ্যমে মানব সম্পদ কার্যাবলির আবির্ভাব দেখানো হলো:

তালিকা : মানব সম্পদ কার্যাবলির আবির্ভাব
কর্মী ব্যবস্থাপনা হতে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা
১৯৭০ এর শুরুতে কর্মী ব্যবস্থাপনার জায়গায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা স্থান দখল করে। নাম পরিবর্তনের সাথে সাথে উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির সীমাও পরিবর্তিত হয়। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যার্জন নিশ্চিত করা। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাজটি দুটি দিকের প্রতি গুরুত্বারোপ করে:
(i) প্রতিষ্ঠানের-লক্ষ্যার্জনে কর্মীদের প্রতিশ্রুতি আদায়;
(ii) ব্যবসায় কৌশল ও মানব সম্পদ কৌশলের মধ্যে সংযোগ ঘটানো।
কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য রয়েছে। একটি প্রধান পার্থক্য হলো- কর্মী ব্যবস্থাপনা হলো অধিকতর যান্ত্রিক ধরনের সংগঠন; অপরদিকে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো- অধিক মাত্রায় বিকেন্দ্রীভূত। পরিবর্তনশীল এবং এর আড়াআড়ি পদ সোপান ও কার্যদল রয়েছে।
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশলগত প্রকৃতির যা কর্মী ব্যবস্থাপনায় নেই। এতসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বলা হয় যে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো কর্মী ব্যবস্থাপনার আধুনিক নাম। তাই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো একটি আধুনিক পদ্ধতি, প্রাচীন কর্মী ব্যবস্থাপনার বিকল্প নয়।
