নৈতিকতার হাতিয়ার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় নৈতিকতার হাতিয়ার। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ৯ এর অন্তর্গত।

নৈতিকতার হাতিয়ার

সাধারণভাবে হাতিয়ার বলতে বুঝায় যন্ত্রপাতি; যা দ্বারা কোনো পণ্য বা বস্তু তৈরি করা যায়। নৈতিক হাতিয়ার বলতে বুঝায় আচরণগত যন্ত্রপাতি বা হাতিয়ার, যার সাহায্যে মানুষের আচরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আনা যায়। এমন কিছু হাতিয়ার রয়েছে যা দ্বারা মানুষের আচরণকে নৈতিকতার দিকে প্রভাবিত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ: সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, অধিকার, কর্তব্য, নৈতিক নিয়মকানুন, সহযোগীদের প্রতি সহানুভূতি প্রভৃতি নৈতিক হাতিয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিচে নৈতিকতার বিভিন্ন ধরনের নৈতিকতার হাতিয়ার সমূহ আলোচনা করা হলো:

 

নৈতিকতার হাতিয়ার

চিত্র: নৈতিকতার হাতিয়ারসমূহ

(ক) সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি (Fairness in outlook) : মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দর হওয়ার জন্য ন্যায়বিচার, সততা, সত্যবাদিতা ইত্যাদি প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এগুলো অধিক প্রয়োজন। এগুলো মানুষের আচরণকে নৈতিক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে সাহায্য করে। সেগুলো হলো:
১। বিচার (Justice) : বিচার বলতে ন্যায়বিচারকে বুঝানো হয়েছে। মানুষ যেকোনো ক্ষেত্রে যেন ন্যায় বিচার পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।

(i) বিনিময় ন্যায়বিচার (Exchange Justice) : এটি দ্বারা বুঝায় যে, কোনো পণ্য বা সেবা অর্থ ও পণ্য অন্য কোনো দ্বারা বিনিময় করা। অর্থাৎ, কাজের বিনিময়ে সঠিকভাবে বেতন বা পারিশ্রমিক প্রদান, নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে পণ্য বিক্রয় ইত্যাদি।

(ii) বন্টণগত ন্যায়বিচার (Distributive Justice) : এটি মালিক, ব্যবস্থাপক, কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মুনাফা বণ্টনের সাথে সংশ্লিষ্ট। এতে বলা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে মুনাফার অংশ ন্যায্যভাবে বণ্টন করে দিতে হবে। শ্রমিকদেরসহ কর্মচারী ও ব্যবস্থাপকদেরকে উচ্চহারে পারিশ্রমিক ও বোনাস, অন্যান্য সুবিধা, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ এবং মালিকদের মুনাফার অংশ দিতে হবে। এটিই ন্যায়বিচার ।

(iii) সামাজিক ন্যায়বিচার (Social Justice) : এর অর্থ হলো ব্যবসায়ীরা ভোক্তা ও সমাজের মানুষদেরকে কীভাবে বা কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন।

২। সত্যকথন (Truth Telling) : এটি ব্যবসায়ে চারটি উপায়ে প্রয়োগ করা হয়, যেমন:

(i) ব্যবসায়ীকে অবশ্যই সত্য বলতে হবে যে, তিনি পণ্য ও সেবা প্রদান করবেন;
(ii) তারা অবশ্যই কর্মী-মালিক সম্পর্ককে লুকাবে না;
(iii) তারা ব্যবসায়ের অবস্থা সম্পর্কে অবশ্যই শেয়ারহোল্ডারদেরকে মিথ্যা বলবে না; এবং
(iv) তারা বিজ্ঞাপনে অবশ্যই সত্য বলবে।

৩। সততা (Honesty) : ব্যবসায়ে সততা প্রয়োগ করা হয় নিম্নলিখিত উপায়ে

(i) ব্যবসায়ীদেরকে অবশ্যই লিখিত অথবা মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে।
(ii) পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে ভুল হলে তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এবং যখনই সম্ভব শুধরাতে হবে।
(iii) সততার সাথে কাজ করার জন্য বেতন বা পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত, যা সততার পুরস্কার হিসেবে গণ্য হবে।
(iv) কার্যসম্পাদনের জন্য শ্রমিকদেরকে কার্যশর্তানুযায়ী পর্যাপ্ত বেতন, পারিশ্রমিক দেওয়া হবে ।
(v) তাদেরকে অবশ্যই সততার সাথে মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যা যৌক্তিক হবে কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি জনিত মুনাফা করবে না ।
(vi) তাদেরকে অবশ্যই ভালো মানের পণ্য দিতে হবে।
(vii) তাদেরকে অবশ্যই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করতে হবে, যেন অসততা ও দুর্নীতি ধরা পড়ে ও দূর করা যায়।

(খ) মূল্যবোধ (Values) : মানুষের মধ্যে কিছু স্থায়ী প্রত্যাশা থাকে যা ভালো বলে প্রতীয়মান হয়; তা-ই মূল্যবোধ। Settin এগুলো মানুষের নৈতিক মান গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে । মূল্যবোধকে “অন্তর্নিহিত বিশ্বাস” বলে আখ্যায়িত করা যা মানুষের মনোভাব ও কার্যকে প্রভাবিত করে। নিচে বিভিন্ন ধরনের মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

১। শেষপ্রান্ত মূল্যবোধ (Terminal Values) : শেষপ্রান্ত মূল্যবোধ বলতে এমন কতগুলো প্রত্যাশাকে বুঝায় যা মানুষ সারাজীবনে অর্জন করতে চায়। অর্থাৎ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও মানুষ সেই সকল প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়। যা জীবনের শুরুতেই প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

২। ব্যক্তিক মূল্যবোধ (Personal Values) : প্রতিটি মানুষের কিছু একান্ত প্রত্যাশা থাকে যা নিজের জীবনের জন্য
অর্জন করতে চায়, তা-ই ব্যক্তিক মূল্যবোধ। যেমন: আরামদায়ক জীবন, স্বাধীনতা, সুখ প্রভৃতি ।

৩। যান্ত্রিক মূল্যবোধ (Instrumental Values) : এটি এমন মূল্যবোধ যা ব্যবহার করে মানুষ তার জীবনের শেষ
প্রান্তের মূল্যবোধকে অর্জন করতে চায়। যেমন: আচরণের ধরন, কাজের ধরন প্রভৃতি।

8। নৈতিক মূল্যবোধ (Moral Values) : নৈতিক মূল্যবোধ হলো মানুষের আন্তঃব্যক্তিক গুণাবলি, যা তাদের আচরণকে প্রভাবিত করে। যেমন: সততা, উৎফুল্লতা, সাহসিকতা, অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা প্রভৃতি। এ সকল নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ কোনো খারাপ কাজে ব্যথিত হয়।

৫। উপযুক্ততা মূল্যবোধ (Competence Values) : এটি এমন কতগুলো উপাদানের সমাহারকে বুঝায় যা মানুষকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলে। যেমন: উচ্চাভিলাষ, সক্ষমতা, মেধা, দায়দায়িত্ব প্রভৃতি। এ সকল গুণ যাদের মধ্যে বিদ্যমান তারা খারাপ কাজে লজ্জিত হয়।

৬। সামাজিক মূল্যবোধ (Social Values) : মানুষ সামাজিক জীব। তাই তারা সমাজে বসবাস করে। তাই সমাজকে বসবাসযোগ্য রাখতে হবে। এ জন্য কতিপয় মূল্যবোধ জাগিয়ে রাখতে হবে। যেমন: সাম্য, জাতীয় নিরাপত্তা, বিশ্বশান্তি প্রভৃতি ।

(গ) অধিকার (Rights) : অধিকার বলতে কোনো কিছু থেকে সুবিধা পাওয়ার ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়ার অবস্থাকে বুঝায়। অধিকার হলো এক ধরনের দাবী যা একজন ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার ক্ষমতা দেয়। আর অধিকারভিত্তিক নৈতিকতা হলো: এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হতে পারবে না । সুতরাং বিস্তৃতভাবে আমরা বলতে পারি যে, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো কাজ করার স্বাধীনতা বা ক্ষমতা অর্জন করাকেই অধিকার বলে। অধিকার তিন ধরনের হয়। যেমন:

১। আইনগত অধিকার (Legal Rights) : যে সকল অধিকার আইনি পদ্ধতিতে লাভ করা হয়, তা-ই আইনগত অধিকার ।

২। নৈতিক (Moral Rights) : সততা ও ন্যায়ের সাথে কোনো কাজ করার অধিকারকে নৈতিক অধিকার বলে যেমন: সত্যকথন, ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো এবং স্বাধীনভাবে কথা বলা ইত্যাদি।

৩। সামাজিক অধিকার (Social Rights) : সমাজের অন্তর্ভুক্ত মানুষের জীবনমান উন্নত করাই হলো সামাজিক অধিকার। যেমন: সকলের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সুস্বাস্থ্যের অধিকার ইত্যাদি।

(ঘ) কর্তব্য (Duties) : অনুমোদনযোগ্য অধিকার ভোগ করার সময় কিছু যৌক্তিক কাজ করার প্রয়োজন হয়। ঐ যৌক্তিক কাজকেই কর্তব্য বলা হয়। মনে রাখতে হবে যে, সুবিধা ভোগ থেকে দায়িত্বের (burden) সৃষ্টি হয়, আর দায়িত্ব থেকে কর্তব্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু দায়দায়িত্ব ও কর্তব্য একে অপরের বিপরীতমুখী কাজ নয়। কর্তব্য নৈতিক আইন মেনে চলে। নৈতিক আইনানুযায়ী আমাদের কর্তব্য ও ব্যয় হলো নৈতিক আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা। কাণ্ট (Kant) মনে করেন, “Ought implies can” অর্থাৎ, “বিবেক সায় দিলে যে কোনো কাজ পারা যায়।” অধিকার ও পরস্পর সম্পর্কিত। যখন কারো কিছু করার অধিকার থাকবে, তখন ঐ কাজটি সঠিকভাবে করা তার কর্তব্য। যাই হোক, পরস্পর সম্পর্কিত কর্তব্য দেখানো হলো:

 

নৈতিকতার হাতিয়ার 2 নৈতিকতার হাতিয়ার

চিত্র: পরস্পর সম্পর্কিত কর্তব্য

(ঙ) নৈতিক আইন (Moral Rules) : নৈতিক আইন হলো এক ধরনের পথনির্দেশিকা যা অনুসরণের মাধ্যমে কাজের প্রতি অনুকূল মনোভাব সৃষ্টি করা যায়। নৈতিক আইন মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে এবং অনেকটা মূল্যবোধের ন্যায় কাজ করে। এটি কয়েক ধরনের হয়। যেমন:

১। মানব সম্পর্ক (Human Relationship) : প্রতিটি মানুষ বিভিন্ন কারণে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। কারণ, কার্যসম্পাদনে প্রত্যেকে কাজে সমর্থন প্রয়োজন। একজন শিশুর যেমন পিতার সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে, তেমনি একজন ব্যবস্থাপকের সাথে কর্মীদের সম্পর্ক গড়ে উঠে। সুতরাং সম্পর্ক গড়ে উঠা একটি নৈতিক জীবনের প্রাপ্তি ।

২। অহিংসা (Non-violence ) : দাঙ্গাহাঙ্গামা থেকে বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। অধিকার ও কর্তব্য তা রোধ করতে সহযোগিতা করে। আমরা যদি সর্বদা নিজেদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকি, তা হলে অন্যকে বিশ্বাস করা যায় না। ফলে তাদের সাথে বিরোধ বেড়ে যাবে। সুতরাং অহিংসা চর্চা করা প্রয়োজন, যেন কেউ কারো ক্ষতির কারণ না হয় এবং সকলের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে।

(চ) সহমর্মিতা (Fellow-Feeling) : সহমর্মিতার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠা। সহকর্মীদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখাও নৈতিক বিধির অন্তর্ভুক্ত।

Leave a Comment