আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় ক্ষতিপূরণ প্রশাসনের মূলনীতিসমূহ
Table of Contents
ক্ষতিপূরণ প্রশাসনের মূলনীতিসমূহ

ক্ষতিপূরণ প্রশাসনের মূলনীতিসমূহ
কর্মীদের পর্যাপ্ত বেতন ভাতা ও সুবিধাদি সরবরাহ করার লক্ষ্যে ক্ষতিপূরণ প্রশাসনকে কতিপয় নীতি প্রণয়ন ও অনুসরণ করা খুবই জরুরি। নিম্নে একটি সুষ্ঠু ক্ষতিপূরণ প্রশাসনের নীতিসমূহ আলোচনা করা হলো।
উপযুক্ততা ও দক্ষতার নীতি (Principle of efficiency):
ক্ষতিপূরণ নীতি এরূপভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপযুক্ত কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের বিশেষভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন এবং এরূপ কর্মীদের জন্য আকর্ষনীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যেমন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য উচ্চ বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা উচিত।
স্থিতিশীলতা (Stability):
প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ নীতি যথেষ্ট স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে দীর্ঘকালের জন্য বেতন জন্য ভাতাদি নিয়মিত চালু রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
সামঞ্জস্যতার নীতি (Policy of consistency):
বাজারে দ্রব্যমূল্য, কর্মীর জীবনমান ও কাজের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষতিপূরণ বা বেতন-ভাতাদি নির্ধারণ করা অপরিহার্য। সমদক্ষতা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন শ্রমিক ও কর্মীর বেতনের মধ্যে যেন পার্থক্য না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
ন্যায্যতার নীতি (Principle of equity) :
প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতনভাতা ন্যায্য ও কাম্য হওয়া আবশ্যক। অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ নীতির সাথে সংগতি ও সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নীতি প্রণয়ন করা খুবই জরুরি।
নমনীয়তার নীতি (Principle of flexibility):
ক্ষতিপূরণ নীতিতে নমনীয়তা থাকা আবশ্যক। শ্রম বাজারের অবস্থা বিবেচনা করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ-খাওয়ানোর জন্য কর্মীদের প্রদত্ত বেতন ভাতা ও সুবিধাদি মাঝে মাঝে প্রয়োজনমত পুনর্মূল্যায়ন ও পুন:নির্ধারণ করা আবশ্যক।
স্বার্থসংরক্ষণ নীতি (Principle of maintaining interest) :
ক্ষতিপূরণ নীতি এমনভাবে নীতি প্রণয়ন, করা উচিত যেন প্রতিষ্ঠানের মালিক, ব্যবস্থাপনা, সকলস্তরের কর্মীবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট গ্রুপ বা দল, সাধারণ জনগণ এবং সর্বোপরি সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণ করা যায়।
কল্যাণমুখিতা (Welfare oriented):
ক্ষতিপূরণ নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত যেন তা কর্মীদের জন্য সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনে। আর এই জন্যই ক্ষতিপূরণ প্রশাসনকে কর্মীর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় রেখে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক সুবিধাদির জন্য নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানকে এমন একটা কল্যাণমুখী ক্ষতিপূরণ নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন যেন তা দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক কল্যাণে অবদান রাখে।
পর্যাপ্ততার নীতি (Principle of availability ) :
ক্ষতিপূরণ নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত যেন তা কর্মীদের জীবনধারণের উপযোগী হয়। জীবনযাত্রার মান রক্ষা করা যায় এমন পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ক্ষতিপূরণ নীতিতে থাকা প্রয়োজন যাতে করে কর্মীরা অধিক উৎসাহ ও চিন্তামুক্তভাবে কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে।
বেতন কাঠামো নির্ধারণ (Determining salary stractural):
ক্ষতিপূরণ নীতি প্রণয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই হচ্ছে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যতার ভিত্তিতে বেতন কাঠামো নির্ধারণ। প্রতিষ্ঠানের কাজের প্রকৃতি, কর্মীর পদ, কাজের ধরন, শ্রম বাজারের চাহিদা ও জোগানের সামঞ্জস্যতা এবং অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত।
কার্যসম্পাদনের মান (Quality of performance) :
প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কার্যসম্পাদনের মান ও পরিমাণ বিবেচনা ও মূল্যায়ন করে ন্যায্য ও যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আবার অপর দিকে ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা এমন আকর্ষণীয় হওয়া উচিত যাতে কর্মীরা তাদের কার্যসম্পাদনের মান উন্নত করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের কাঠামো (Structure of the organization) :
প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর ভিত্তিতে পদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিবেচনা করে ন্যায্য ও যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণের নীতি প্রণয়ন করা আবশ্যক। এছাড়া কর্মীদের পদোন্নতি পরিকল্পনার দিকেও দৃষ্টি দেওয়া অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ।
প্রণোদনামূলক ক্ষতিপূরণ নীতি (Principle of incentive compensation) :
প্রতিষ্ঠানে প্রণোদনামূলক ক্ষতিপূরণ নীতি শ্রমিক কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করে। এছাড়াও প্রণোদনামূলক ক্ষতিপূরণ নীতি কর্মীদের কার্যপরিত্যাগের হার হ্রাস করে এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। তাই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রণোদনামূলক ক্ষতিপূরণ নীতি থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত ভাতা (Additional compernsation for additional duty) :
প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ নীতিতে অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত ভাতার ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। এছাড়াও কর্মীদের নৈশকালীন কাজ করানোর জন্য অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে কোনো ছুটির দিনে কাজ করানোর জন্য কর্মীদের বাড়তি ক্ষতিপূরণ প্রদান করা উচিত।
অভিযোগ গ্রহণ (Attention of complain):
প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও কর্মীদের অভিযোগসমূহ গুরুত্ব ও মনোযোগের সাথে শ্রাবণ এবং তা নিস্পত্তিকরণ ক্ষতিপূরণ নীতি প্রণয়নের উল্লেখযোগ্য দিক। কর্মীদের অভিযোগ শ্রবণ ও নিস্পত্তির জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের সুযোগ থাকা আবশ্যক।
ছুটি ভাতা মঞ্জুর ( Payment for leave and holidays) :
প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মীদের সাধারণ ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি ও অন্যান্য আইনানুগ ছুটির জন্য ন্যায্য এবং যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ তথা বেতন-ভাতাদি প্রদানের নীতি থাকা খুবই প্রয়োজন ।
বাজেট ভিত্তি (Basis of budget) :
প্রতিষ্ঠানের বাজেটের অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আর এরূপ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে পরিকল্পিত, নিয়মিত এবং দীর্ঘকালীন ক্ষতিপূরণ সম্ভব হয়।

চাকরির স্থায়িত্ব ও নিয়োগবিধি (Stability of tenure and employment rule ) :
প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দীর্ঘকাল প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রশাসন তথা বেতন-ভাতা প্রশাসনের খেয়াল রাখা আবশ্যক। এজন্য প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধি পর্যালোচনা করে চাকরিতে ধরে রাখা যায় বা চাকরির স্থায়িত্ব বজায় রাখার যায় এমন ক্ষতিপূরণ প্রশাসন তথা বেতন-ভাতা প্রশাসন নীতি চালু করা প্রয়োজন ।
