আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ
Table of Contents
প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ
প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার আকৃতি, কাজের ধরন, কর্মীর সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনা করে কর্মী প্রশিক্ষণের পদ্ধতি নির্ধারন করে থাকে। মূলত কর্মীদের প্রয়োজন বিবেচনা করেই প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। নিম্নে প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো ।

চিত্র : কর্মী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি
কাজের মধ্যে প্রশিক্ষণ (On the job training) :
কর্মীকে বাস্তবজ্ঞান প্রদানের জন্য কাজ চলাকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সহকর্মীর তত্ত্ববধানে রেখে কর্মীকে হাতে কলমে যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তাকে কাজের মধ্যে প্রশিক্ষণবলা হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় কর্মী কাজ করতে করতে কার্যপ্রক্রিয়া ও কর্মকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। নিম্নে কাজের মধ্যে প্রশিক্ষনের বিভিন্ন ধরন আলোচনা করা হলো:
শিক্ষানবিস প্রশিক্ষণ (Apprenticeship training):
কাজের দক্ষতা অর্জনের জন্য অপেক্ষাকৃত কম বেতন বা নির্দিষ্ট ভাতার বিনিময়ে কোনো তত্ত্বাবধায়কের তত্ত্বাবধান থেকে তাত্ত্বিক ও বাস্তবজ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষানবিস নিয়োগের ব্যবস্থা করে থাকে। এই ধরনের শিক্ষণাবিস নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো তত্ত্বাবধায়ক বা অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের অধীনে হাতে কলমে কার্য সম্পাদনের কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর ঐ সকল শিক্ষানবিসদের প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর্মী হিসাবে নিয়োগদান করে তাকে। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একদল কৌশলী দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা। তবে এই পদ্ধতির একট সমস্যা আছে। সমস্যাটা হলো এই যে, নিয়মিত কর্মী পদে নিয়োগের পূর্বে শিক্ষানবিসদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। দ্রুত নিয়োগ না পেলে তাদের অনিশ্চয়তার মাত্রা আরো বেড়ে যায়।
কর্যনির্দেশণা প্রশিক্ষণ (Job instruction training) :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তথা ১৯৪০ সালের সমসাময়িক সময়ে এই ধরনের প্রশিক্ষণের প্রচলন হয়। প্রেষণা, বোধগম্যতা, অংশগ্রহণ এবং প্রয়োগ এই চারটি উপাদান শিক্ষণের লক্ষ্যে কার্যনির্দেশণা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন দক্ষ প্রশিক্ষকের অধীনে কর্মীদের রেখে তাদের কার্যসংক্রান্ত নির্দেশণা হাতে-কলমে প্রদান করা হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃক প্রশিক্ষণ নিয়ে তার বিভাগের কর্মীদের ওপর তা প্রয়োগ করার কৌশল শেখানো হয়।
পদ আবর্তন প্রশিক্ষণ (Job rotation):
এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোনো কর্মীর স্ব-পদে কাজের দক্ষতা অর্জনের পর অন্য পদের কাজের দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে আবর্তন সমমর্যাদা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। সাধারণত কর্মকর্তা পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে এরূপ প্রশিক্ষণের দ্বারা কার্যক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলা হয়। এই পদ্ধতিতে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে আবর্তনের ফলে তাদের কাজের একঘেয়েমি দূর হয় এবং কর্মে উৎসাহ বৃদ্ধি পায় ।
পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (Under study method):
পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অনেকটা শিক্ষানবিস প্রশিক্ষণের মতো। শিক্ষণবিস প্রশিক্ষণের মত এই পদ্ধতিতেও প্রশিক্ষণার্থীরা একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ নির্বাহী পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির অধীনে কার্য সম্পাদন করে থাকে। এই পদ্ধতি সাধারণত নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। এ ব্যবস্থায় নির্বাহী তার ঊর্ধ্বতনের নিকট থেকে দৈনন্দিন কাজ কর্ম এবং সমস্যার সমাধানসম্পর্কিত বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করে থাকে।
কোচিং পদ্ধতি (Coaching method):
সাধারণত নবনিযুক্ত কর্মীদের অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের অধীনে হাতে-কলমে কার্য সম্পাদণের শিক্ষা দেওয়াকে কোচিং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বলে। এই পদ্ধতিতে কর্মীকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে কর্মকালীন কোনো একজন নির্বাহী বা অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে রেখে হাতে-কলমে জ্ঞানদান করা হয়ে থাকে ।
কাজের বাইরে প্রশিক্ষণ (Off the job training) :
প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাজের অভ্যন্তরে যেমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ঠিক তেমনি কাজের বাইরেও কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। নিম্নে কাজের বাইরে প্রশিক্ষনের বিভিন্ন ধারণা আলোচনা করা হলো ।
অনুকরণ প্রশিক্ষণ (Simulated training):
এই ধরনের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে একটি কৃত্রিম কার্য পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় এবং এই কৃত্রিম পরিবেশে কর্মীদের কাজ করার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
ভূমিকা পালন বা নাট্যাভিনয় কৌশল ( Role play):
এটি মূলত একটি নাট্যাভিনয় কৌশল। এই পদ্ধতিতে কার্য সম্পাদন ও সমস্যা সামাধান বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করে। এই পদ্ধতিতে মূলত এক একজন প্রার্থী এক একটি ভূমিকায় চরিত্র রূপায়নের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে। উদাহরণস্বরুপ একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে একজন বিক্রেতা এবং দুইজন ক্রেতার ভূমিকায় অভিনয় করেন।
প্রশিক্ষক বিক্রেতাকে বিক্রয়ের কৌশলগুলো প্রয়োগ করতে বলবেন। অন্যকর্মী ও প্রশিক্ষণার্থীরা অভিনয় দেখাবেন এবং পরে তার মূল্যায়ন করতে বলবেন। এভাবে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক বিভাগে কর্মরত ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের মধ্যে ভূমিকা পালন বা নাট্যাভিনয় কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে। কর্মীদের মানবীয় সম্পর্ক ও আচরণের প্রভাব সম্পর্কিত বিষয় শেখানোর জন্য নাট্যভিনয় কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
কেস স্টাডি বা ঘটনা পর্যালোচনা পদ্ধতি (Case study):
কেস স্টাডি পদ্ধতি প্রবর্তন করেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল (Harvard Business School)। প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের জন্য কেস স্টাডি বা ঘটনা পর্যালোচনা পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
এই পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সমস্যা নির্ধারণ, তথ্য ও মতামতের পার্থক্য নিরূপণ, বিকল্প কার্যপন্থা উদ্ভাবন এবং সর্বোত্তম কার্যপন্থা নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটনার সমাধান বের করা হয়।
বক্তৃতা পদ্ধতি (Lecture methods):
বক্তৃতা বা লেকচার পদ্ধতি হচ্ছে সবচেয়ে পুরাতন ও অধিক ব্যবহৃত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একসাথে অনেকজনকে একই শ্রেণিকক্ষ বা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বসিয়ে একজন অভিজ্ঞ ও পারদর্শী প্রশিক্ষক দ্বারা বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কর্মীদের তাত্ত্বিক ক্ষমতা উন্নয়নের জন্য বক্তৃতা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বক্তৃতা বা লেকচারকে আকর্ষণীয় করা জন্য প্রশিক্ষক বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করেন যেমন- কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ইত্যাদি ব্যবহার এর মাধ্যমে চার্ট, রেখাচিত্র, ছবি ইত্যাদি স্লাইডে প্রদর্শন করে প্রশিক্ষণার্থীকে সহজেই প্রশিক্ষণ দিতে পারে। বক্তৃতা পদ্ধতির মূল অসুবিধা হচ্ছে এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থীদের সক্রিয় ভূমিকা থাকে না।

সেমিনার, ওয়ার্কশপ, কনফারেন্স (Seminar, workshop, conference) :
সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সের মাধ্যমে একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জ্ঞানবৃদ্ধি করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞ ও পারদর্শী ব্যক্তির অংশগ্রহণের মাধ্যমে আলোচনা এবং প্রশ্নোত্তর পর্বের দ্বারা বিভিন্ন কার্যের কৌশল, ধরন, সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের পথ ইত্যাদি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
