আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশে কৌশলগত মানব-সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবিত মডেল। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১৩ এর অন্তর্গত।
Table of Contents
বাংলাদেশে কৌশলগত মানব-সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবিত মডেল
বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ নেই। কিছু প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই সংস্থাপন বিভাগ বা প্রশাসনিক বিভাগ কর্তৃক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। জাতীয় পর্যায়ে প্রচুর মানব সম্পদ রয়েছে। তথাপি মানব সম্পদের জন্য আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় নেই।
তাই বলা যায় যে, মানব সম্পদ কার্যক্রম হলো একটি অবহেলিত দিক, সেক্ষেত্রে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনারতো প্রশ্নই আসে না। যাই হোক, এ সকল দিক বিবেচনা করে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি মডেল উন্নয়ন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করতে পারে। নিচে চিত্রের সাহায্যে প্রস্তাবিত কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা মডেলটি দেখানো হলো :

চিত্র : বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য মডেল।
উল্লিখিত চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, মডেলের ২০টি বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে। এ সকল ক্ষেত্রের কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সুষ্ঠুভাবে অর্জিত হবে। কিন্তু সবগুলো ক্ষেত্রকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চপর্যায় ব্যবস্থাপনাকে এ বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন করতে হবে। নিচে মডেলের উপাদানসমূহ আলোচনা করা হলো :
১। কৌশলগত মানব সম্পদ পরিকল্পনা (Strategic HR Planning) :
কৌশলগত মানব সম্পদ পরিকল্পনা হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কী করা হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাময় ও বর্তমান কর্মীদের করণীয় ঠিক করা হয়।
২। কার্য বিশ্লেষণ (Job Analysis) :
কার্য বিশ্লেষণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি সম্পাদনে কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, নৈপুণ্য, সক্ষমতা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, কর্তব্য ও দায়িত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, যেন সংশ্লিষ্ট কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা যায় ।
৩। কার্য নকশা (Job Design) :
এটি হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজের কাঠামো প্রণয়ন করা যে, কাজটি কীভাবে সম্পাদন করা হবে। প্রতিটি কাজের সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন ।
8। কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন (Recruitment & Selection) :
কর্মী সংগ্রহ হলো কাজের জন্য কর্মীদেরকে আহবান জানানো। এ পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যানুসন্ধানকারীদের নিকট থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করা হয়। অতঃপর কর্মী নির্বাচনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অর্থাৎ, যাচাই-বাছাই করে কর্মী নির্বাচন করা হয়।
৫। সমতা ও বৈচিত্র্যতা (Equity & Diversity) :
সমতা এর অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রমিক-কর্মীর সাথে সমান আচরণ করতে হবে। কেউ যেন কোনো কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। আর বৈচিত্র্যের অর্থ হলো: কর্মীদেরকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা। একজন শুধু একই কাজ করবে তা নয়; অন্য কাজের জন্যও তার মেধা থাকতে পারে।
৬। সামাজিকীকরণ, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন (Socialization, Training & Development) :
সামাজিকীকরণের অর্থ হলো নতুন কর্মীদেরকে বর্তমান পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা। প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন হলো কর্মীদের dow দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ানোর প্রক্রিয়া।
৭। Go to Settings to activa কার্য মূল্যায়ন (Job Evaluation) :
কার্য মূল্যায়ন হলো প্রতিষ্ঠানের কার্যের মূল্যায়ন যাতে কর্মীদেরকে পরিশোধ কাঠামোর সঠিক স্থানে স্থাপন করা যায়।
৮। বেতন ও মজুরি (Compensation) :
কর্মীদের মানসিক শ্রমের জন্য বেতন দেওয়া হয় আর শ্রমিকদের শারীরিক শ্রমের জন্য মজুরি দেওয়া হয় ।
৯। কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন (Performance Appraisal) :
এটি হলো এমন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কর্মীদের সম্পাদিত কার্য মূল্যায়ন করা হয় যেন অর্পিত কাজ আর সম্পাদিত কাজের মধ্যে তুলনা করে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্যাকেজ নির্ধারন করা যায়।
১০। সুবিধাসমূহ ও কর্মীদের অধিকার (Benefits & Employees Right) :
সুবিধাসমূহ হলো মালিক কর্তৃক কর্মীদেরকে প্রদত্ত আর্থিক সুবিধা যা মালিকগণ কর্মীদের কার্যে সন্তুষ্ট হয়ে প্রদান করে থাকে ।
১১। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (Health & Safety) :
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় কর্মী ও মালিক বা ব্যবস্থাপনা উভয়কেই কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই। তা না হলে উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে না ।
১২। নৈতিকতা (Ethics) :
ভালো ও মন্দের মধ্যে বা সঠিক ও বেঠিক কাজের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করাই হলো নৈতিকতা। এটি হলো একজন মানুষের মধ্যে কতগুলো গুণের সমষ্টি যা মানুষের জীবনের ও কার্যপরিবেশের অংশ ।
১৩। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Improving Productivity) :
উৎপাদনশীলতা হলো কাঁচামাল ও উৎপাদনের মধ্যকার অনুপাত বা সম্পর্ক। কর্মীদেরকে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। তা না হলে প্রতিষ্ঠান টিকতে পারবে না।
১৪। অভিযোগ পরিচালনা (Grievance Handling) :
কর্মীদের মধ্যে যদি কোনো অভিযোগ উঠে বা কোনো বিষয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়; তা হলে তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বা দূর করতে হবে। কারণ কর্মীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি থাকলে কার্যপরিবেশ নষ্ট হয়।
১৫। শৃঙ্খলা বিধান কার্যক্রম (Disciplinary Action) :
শ্রমিক-কর্মীদের মধ্যে যদি কোনো রকম শৃঙ্খলার পরিপন্থি বা বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা হলে তা অবশ্যই ব্যবস্থাপনা কর্তৃক নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যাতে প্রতিষ্ঠানে শান্তি বজায় থাকে ।
১৬। শ্রমিক-ব্যবস্থাপনার মধ্যে সম্পর্ক (Labour Management Relations) :
প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-মালিক, শ্রমিক- ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপনা মালিক প্রভৃতি পক্ষের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা-ই শিল্পসম্পর্ক। এ সম্পর্ক যত ভালো হবে, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তত সাবলীলভাবে চলবে। প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের জন্য এ সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে ।
১৭। পেশা পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (Career Planning & Development) :
প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রত্যেক কর্মীর অবশ্যই পেশা পরিকল্পনা ও উন্নয়নের সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সাহায্য করতে হবে।
১৮। পৃথকীকরণ ও পুনর্গঠন (Separation and Restructuring) :
পৃথকীকরণ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের পরিবর্তন সাধন করা হয়। এটি নিচের স্তর থেকে উচ্চ স্তর সকল পর্যায়ে হয়ে থাকে ।
১৯। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি (Corporate Culture) :
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব কিছু রীতি ও মূল্যবোধ থাকে, যা অবশ্যই উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে নিচের পর্যায়ের সকলকে মানতে হবে। এতে কর্মীদের মধ্যে নৈতিকতা ও আচরণ, পরিবর্তন আসবে।
২০। পরিবেশ (Environment) :
পরিবেশ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ বা কার্য গ্রহণ ও পরিচালনা করতে হলে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ অনুকূলে থাকতে হবে। সুতরাং ব্যবস্থাপনাকে এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।

