আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বাহ্যিক সমতা প্রতিষ্ঠাকরণ। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ৮ এর অন্তর্গত।
বাহ্যিক সমতা প্রতিষ্ঠাকরণ

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একই পদে নিয়োজিত কর্মী বা নির্বাহীর বেতন কাঠামোর তুলনামূলক পার্থক্যকেই বাহ্যিক সমতা বা External Equity বলে। বাহ্যিক সমতা শুধুমাত্র ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাহিরের কার্যসম্পর্ক তুলে ধরে। এতে করে ব্যবস্থাপকের বয়স, মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি ঐ কোম্পানির আকার ও অবস্থান অনুযায়ী ব্যবস্থাপকের বেতনের তারতম্য ঘটে। বাহ্যিক সমতা কর্মীর বেতন কাঠামোর নিয়ামক।
নিম্নে বাহ্যিক সমতার কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো :
১ . পারিশ্রমিক ও বেতন জরিপ (Compensation survey) : পারিশ্রমিক ও বেতন জরিপ বলতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিকের মূল্যায়ন পর্যালোচনা করাকে বুঝায়। প্রতিযোগিতামূলক সুন্দর ও স্বচ্ছ পারিশ্রমিক কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পারিশ্রমিক ও বেতন জরিপের উপর নির্ভর করে নিচের বিষয়সমূহ এই জরিপের অন্তর্ভুক্ত করা হলো :
ক. সুনির্দিষ্ট কাজ চিহ্নিতকরণ (Identifying key jobs) : সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ বা পদকে চিহ্নিত করতে হলে বেতন কাঠামো তৈরি করতে হয়। এতে করণীয় হলো :
১. পদ বিষয়টি সময়োপযোগী হতে হবে।
২. ঐ পদটির প্রকৃতি এমন হতে হবে যেন ঐ পদের কার্যক্রম বিষয় সব প্রতিষ্ঠানে সমান হয়।
৩. জরিপকৃত প্রতিষ্ঠান ও যে প্রতিষ্ঠানের জন্য জরিপ করা হচ্ছে সেখানে ঐ পদের অস্তিত্ব আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে।
৪. শুধুমাত্র এন্ট্রি লেভেল জব নয়, মধ্যম ও উপর লেভেলের পদকে এই জরিপের আওতায় আনতে হবে।
৫. খুব সতর্কতার সাথে job description বা কার্য বর্ণনা তৈরি করতে হয়।
খ. জরিপের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন (Selecting organizations to survey) : প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হচ্ছে জরিপের জন্য জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জরিপের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হলে নিম্নোক্ত বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে:
১. একই যোগ্যতায় অধিক কর্মী কাজে নিয়োজিত করতে হবে।
২. ভৌগোলিক দৃঢ়তা বিদ্যমান থাকতে হবে।
৩. জরিপের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে কিছু পরিবর্তন থাকতে হবে। এলাকা ও শিল্পভিত্তিক বিবেচনা, বেতন কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন থাকতে হবে।
গ. তথ্য সংগ্রহকরণ (Collecting data) : প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তার কাজের ধরন ও আকার বিবেচনা করে বিভিন্ন তথ্যসংগ্রহ করে থাকে । তথ্য সংগ্রহ করতে হলে নিচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হবে :
১. প্রতিবছর বাৎসরিক জরিপ খোঁজ করে দেখা যেতে পারে।
২. স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের পরামর্শ নিতে হবে ।
৩. Professional Associations থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে
৪. বিভিন্ন সংস্থা বা জরিপ ফার্মের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৫. ব্যক্তিগত জরিপ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নিম্নোক্ত তথ্যাবলির খোঁজ নেওয়া যেতে পারে-
ক. বিক্রয়
খ. নিট লাভ,
গ. ফার্মের অবস্থান,
ঘ. ফার্মের আকার,
ঙ. মোট কর্মীর সংখ্যা,
চ. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পারিশ্রমিক,
ছ. বাজারের অবস্থান ও উৎপাদিত পণ্যের পরিচিতি,
জ. কোম্পানির আর্থিক অবস্থা,
ঝ. নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণ,
ঞ. অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা ইত্যাদি।
৬. বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদক্রম এবং পদ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনলাইন জরিপ করে বেতন কাঠামো জানা যেতে পারে।
৭. তথ্য সংগ্রহ করার জন্য সরকারি জরিপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এ বিষয়ে প্রতি বছর আমাদের দেশে সরকারি জরিপ হয়।
ঘ. সংগৃহীত তথ্যের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ (Explanation of collected information) : তথ্য সংগ্রহের সাথে সাথে তা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্যের বিশ্লেষণ স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও জরিপ সমন্বয় করে করতে হবে। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়াদি বিবেচনায় আনতে হবে। যেমন-
১. কোনো ক্রমেই জরিপকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না ।
২. অত্যন্ত সাবধানতার সাথে জরিপকৃত তথ্য সম্পাদন করতে হবে।
৩. যথাযথ পরিসংখ্যান হতে প্রতিটি কার্যের বর্ণনা প্রদান করতে হবে।
৪. তিন মাস অন্তর অন্তর বেতনের তথ্য প্রদান করতে হবে ।
৫. আধুনিক পন্থায় কার্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের সংরক্ষণ করতে হবে।
২. বেতন সমতা পদ্ধতি (Pay-level policy) : প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে তাদের পলিসি মেনে চলে। প্রতিষ্ঠানভেদে পলিসির কার্যের ধরন বিভিন্ন হয়ে থাকে। তবে সকল পদের জন্য একই পলিসি মেনে চলা উচিত হয় না। তাই Pay-level policy একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। Pay-level policy অনুসরণ করতে হলে নিচের বিষয়গুলো আনতে হবে ।
১. সাম্যকরণ পন্থা (Equalization method) ব্যবস্থা বিবেচনায় থাকতে হবে ।
২. শীর্ষ পন্থা (Lead policy) এর পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
৩. ধীর পন্থা (Slow way) ব্যবহার করতে হবে ।
১. সাম্যকরণ পদ্ধতি (Equalization method) : যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগী থাকে। প্রতিযোগী না থাকলে ব্যবসায় সফলতা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে তাদের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরের প্রতিযোগিতার সাথে সমতা বিধানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বেতন কাঠামো সমান রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এটাই মূলত সাম্যকরণ পদ্ধতি । সাম্যকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
২. শীর্ষ পদ্ধতি (Lead policy) : বেতন কাঠামো যে কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি কার্যকর পন্থা। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান তার কর্মচারীদের যেভাবে বেতন কাঠামো দিয়ে থাকেন, তার থেকে সর্বোচ্চ বেতন কাঠামো প্রদান করার নীতিকে শীর্ষ পন্থা বা Lead policy বলে। শীর্ষ পন্থার মাধ্যমে যে কোনো কোম্পানি তার কর্মীদের কার্যসন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যায়।
৩. ধীর পন্থা (Slow way) : প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক কর্মীর বেতন সমান হতে পারে না। কাজের ধরন অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মীর বেতন নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এই পন্থার একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠান তার প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান হতে বেতন সর্বনিম্ন রাখে, এক্ষেত্রে দেখা যায় যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীল (Productive) নয় এবং অলাভজনক (non-profitable) তারা এই পন্থার আওতাধীন।

প্রতিষ্ঠান কীভাবে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে এটাই তার মুখ্য বিষয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যবসায়ের আকার, প্রকৃতি ও দর্শন (Philosophy) অনুযায়ী বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এভাবে মূলত বাহ্যিক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাহ্যিক সমতা (External equity) প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
