বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

সঠিক প্রার্থী নির্বাচনের লক্ষ্যে আবেদনপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে চূড়ান্ত নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মানব সম্পদ নির্বাচনের এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া বলে। বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থী প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের আয়তন, অবস্থান, কাজের প্রকৃতি, নিজস্ব মানব সম্পদ পলিসি ভিন্নতার দরুন নির্বাচন পদ্ধতির কিছুটা ভিন্নতা হয়ে থাকে।

নিম্নে বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্ননা করা হলো :

 

বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

চিত্র : বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

আবেদনপত্র গ্রহণ (Recipient of appication):

সাধারণত পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রদানের মাধ্যমে মানব সম্পদ বিভাগ প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদ পূরণের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের লিখিত আবেদন করার আহ্বান জানিয়ে থাকে । এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনে পদের নাম, সংখ্যা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা, প্রদেয় বেতন, আবেদনের শেষ তারিখ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজ পত্রের কথা উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপনের আলোকে সম্ভাব্য আবেদনকারী সাদা কাগজে অথবা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত আবেদন ফরমে নির্দিষ্ট পদের জন্য লিখিত আবেদন করে। আবেদনপত্রে সাধারণত আবেদনকারীরা তাদের নাম, ঠিকানা, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্ম অভিজ্ঞতা, রেফারেন্স বা পরিচয় সূত্র, প্রার্থীর স্বাক্ষর, তারিখ এবং সংযুক্তিসহ হাতে হাতে বা ডাকযোগে বা অনলাইনে প্রেরণ করে।

প্রাপ্ত আবেদনপত্র বাছাইকরণ (Selecting the applications):

আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর নির্দিষ্ট পদের জন্য বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত তথ্যাদি এবং শর্তাদি মোতাবেক প্রার্থী যথাযথভাবে আবেদনপত্র পূরণ করে পঠিয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়। সঠিক আবেদনের তালিকা করা হয় এবং ত্রুটিপূর্ন আবেদন বাতিল করা হয়।

নিয়োগ পরীক্ষা (Employment test):

আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করার পর বাছাইকৃত আবেদনকারীদেরকে পরীক্ষার জন্য আহ্বান করা হয়। প্রার্থীদের জ্ঞান ও মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক ও চূড়ান্ত লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে। প্রতিভাবান মানব সম্পদ নির্বাচনই লিখিত পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে অকৃতকার্য প্রার্থীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ (Interview) :

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণকে মৌখিক পরীক্ষা নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিষয়, ব্যক্তিত্ব, আচরণ, প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিষয়, ব্যক্তিত্ব, প্রকাশভঙ্গি, মনোবল, জ্ঞান, দক্ষতা এবং তাৎক্ষনিক বুদ্ধিমত্তা যাচাই করে থাকেন।

মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা (Psychological test):

সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষার পর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর আগ্রহ, বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব প্রবণতা ও দক্ষতা ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়। নিম্নে বিভিন্ন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো :

বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা (Intelligence test) :

বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা দ্বারা প্রার্থীর মানসিক ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, বোধশক্তি, চিন্তাশক্তি, মেধাশক্তি, যুক্তিবাদিতা ইত্যাদি বিষয়সমূহ যাচাই করা হয়। বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষাকে বিনে সাইমন বুদ্ধিস্কেল, ওয়েসলার বুদ্ধি স্কেল ও যৌথ বুদ্ধি পরীক্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।

আগ্রহ পরীক্ষা (Interest test):

এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো বিষয় বা কাজের প্রতি প্রার্থীর আগ্রহ কেমন সেটি পরীক্ষা করা হয়।

প্রবণতা বা ঝোঁক পরীক্ষা (Aptitute test):

এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রার্থীর সুপ্তজ্ঞান, প্রতিভা ও প্রবণতা পরিমাপ করা হয়। কার্যক্ষেত্রে কর্মী কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারবে তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়। বিশেষজ্ঞগণ ঝোঁক পরীক্ষার নয়টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। যথা: (i) বুদ্ধিমত্তা (ii) সংখ্যাসম্বন্ধীয় ঝোঁক (iii) ক্রিয়াঘটিত (iv) স্থানসংক্রান্ত ঝোঁক (v) আকার প্রত্যক্ষণ (vi) করণিক প্রত্যক্ষণ (vii) গতি সঞ্চালন সমন্বয় (viii) আঙ্গুলের দক্ষতা (ix) দৈহিক দক্ষতা

সাফল্য পরীক্ষা (Achievement Test) :

এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয় প্রার্থী কোনো বিশেষ কাজে কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারবে।

ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা (Personal qualification):

এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর মানসিক গঠন, অভ্যাস, পছন্দ- অপছন্দ, প্রকৃতি, উৎসাহ, আত্মবিশ্বাস, বিচারবোধ ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়।

ব্যাক্তিগত যোগ্যতা পরীক্ষা (Personality test):

এই পরীক্ষার মাধ্যমে কাজ সম্পর্কে প্রার্থীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিরুপণ করা হয়। এরূপ পরীক্ষাকে দক্ষতা পরীক্ষা নামেও অভিহিত করা হয়। মানব সম্পদের কাজ সম্পর্কে জ্ঞানের মাত্রা জানার জন্যই মূলত এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

অভিক্ষেপন পরীক্ষা (Projective test) :

এই পরীক্ষার মাধ্যমে সন্দেহের উদ্রেক করে এমন বিষয়সমূহ সম্পর্কে প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি পরীক্ষা করা হয়।

 

পূর্ব ইতিহাস অনুসন্ধান (Investigation of previous history):

মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদেরকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচনের লক্ষ্যে পূর্ব ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অতীত জীবন এবং পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে অনুসন্ধান করা হয়। এক্ষেত্রে প্রার্থীর আবেদনপত্রে উল্লিখিত রেফারেন্স বা পরিচয়সূত্র থেকে প্রার্থীর অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পুলিশ বিভাগের সাহায্যে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে অনুসন্ধান করা হয়।

প্রার্থীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে তার কর্মকান্ড ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হয়। প্রার্থীর পূর্ববর্তী নিয়োগকর্তার কাছ থেকেও প্রার্থীর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়। প্রার্থীর পূর্ব ইতিহাস অনুসন্ধানের দ্বারা প্রার্থীর আবেদনের সাথে সংগৃহীত তথ্যের তুলনা করে এর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়।

প্রাথমিক নির্বাচন (Preliminary Selection ):

প্রার্থীর লিখিত ও সাক্ষাৎকার পরীক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক ঝোঁক পরীক্ষা এবং পূর্ব ইতিহাস অনুসন্ধান পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল প্রতীয়মান হলে প্রার্থীদেরকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। এবং এর একটি তালিকা প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়। এক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রার্থীকে একটি অপেক্ষমান তালিকাও প্রণয়ন করা যেতে পারে ।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Physical examination ) :

প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীদের দৈহিক ও মানসিক সুস্থ্যতা, ওজন, উচ্চতা, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, রক্তচাপ, সংক্রামক ব্যাধি, এইডসসহ মারাত্বক ব্যাধি পরীক্ষা করা হয়।

মূলত: কর্মীর মানসিক ও শারিরীকভাবে সুস্থ্য আছে কিনা তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রতিকূল রিপোর্ট প্রাপ্ত প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে বাতিল বা অযোগ্য বলে গণ্য করা হয়।

চূড়ান্ত নির্বাচন (Final selection):

এই পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয় এবং চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রণয়ন করে নিয়োগের সুপারিশসহ অনুমোদনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়।

স্থাপনা ও নিয়োগ বা পদায়ন (Placement or appointment):

এ পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও বিভাগ নির্দিষ্ট পদে যোগদানের জন্য নিয়োগপত্র প্রদান করে। এই নিয়োগপত্রে পদের নাম, কর্মস্থল, বেতনস্কেল, ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা যোগদানের সময়সীমা এবং অন্যান্য শর্তাবলি উল্লেখ করা হয়।

 

বিমুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া

 

যোগদানের রিপোর্ট গ্রহণ (Joining Report ) :

নিয়োগপত্রের শর্তাদি মেনে স্ব-স্ব কর্মস্থল স্ব-স্ব পদে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগদান করে কাজে যোগদানের রিপোর্ট প্রদান করলে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মীদের কাজের পরিবেশ, কাজের ধরন, প্রতিষ্ঠানের আদর্শ, রীতিনীতি, পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিতি করানোর জন্য প্রাথমিক পরিচিতিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।

Leave a Comment