আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
Table of Contents
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দক্ষ জনশক্তি সংগ্রহ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। মানব সম্পদের উন্নয়ন এবং তার পরিপূর্ণ ও ফলপ্রসূ ব্যবহারই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাজে উৎসাহিত করা, ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সেটাকে ধরে রাখা,
প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে উপযুক্ত কার্যপরিবেশ তৈরি করা এবং যথোপযুক্ত ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণের মাধ্যমে কর্মীদের কার্যসন্তুষ্টি অর্জন। একটা সময় ছিলো যখন সংগঠনে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার তেমন গুরুত্ব ছিলো না, কিন্তু বর্তমানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এটা এখন শুধু সংগঠনের গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয় বরং সমগ্র দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকল্পে মানব সম্পদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আজ সবার কাছে স্পষ্ট এবং সর্বজনবিদিত।
মানব সম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে Lawrance A. Apply বলেছেন যে, “ব্যবস্থাপনা যদি স্বীকার করে যে, ব্যবস্থাপনা মানেই কর্মীদের উন্নয়ন এবং মানব সম্পদের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা, তাহলে ব্যবস্থপনাসংক্রান্ত অনেক সমস্যাই সহজভাবে সমাধান হয়ে যাবে”। এই প্রসঙ্গে তার মতামত হলো ব্যবস্থাপনা মানেই কর্মী বা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা।
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে Professor Mayer বলেন, “যে সব প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না সে সব প্রতিষ্ঠানকে শিল্প প্রতিষ্ঠান না বলে যন্ত্রপাতি বলা যেতে পারে”। এই জন্যই মানব সম্পদকে একটা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাণ-সম্পদের উন্নয়ন ও যথাযথ মূল্যায়ন খবুই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তি বা আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে পারে, কিন্তু মানব সম্পদের উন্নয়ন ও যথাযথ ব্যবহার ছাড়া প্রতিষ্ঠানের উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব নয়। একারণেই বিশ্বায়নের এই প্রবল প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানব সম্পদের উন্নয়ন এর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপের কোনো বিকল্প নেই । নিন্মে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Increase Productivity):
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একটি প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তি আর আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই ঐ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে তা কিন্তু নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল যারা কিনা ঐ উন্নত প্রযুক্তি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারবে।
আর এই কাজের জন্যই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু ও যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্যই হলো দক্ষ কর্মীবাহিনী গঠন এবং তাদের দ্বারা Optimum বা শতভাগ কার্য সম্পাদন নিশ্চিত করা।
সংগঠনের প্রানশক্তি (Heart of the organization) :
মানব সম্পদকে একটি সংগঠনের প্রাণশক্তি বলা যায়। কারণ মানব শরীরে যদি প্রাণ না থাকে তবে সেটি যেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ঠিক তেমনি সংগঠনেও যদি মানব সম্পদের কার্যকরি ভূমিকা না থাকে তবে সেটিও প্রাণহীন মানবদেহের ন্যায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা (Maintaning the continuation of production) :
উৎপাদনের চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বায়নের এই যুগে আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ব্যবসায় ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন।
কারণ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমেই যোগ্য কর্মী বাছাই করে তাদের প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, প্রণোদনাদান এবং উপযুক্ত কার্য পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন (Achieving the goal of the organizaiton) :
প্রতিষ্ঠানের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠানের অন্যসব উপকরণের সাথে সংগঠনের মানবীয় উপাদান তথা মানব সম্পদের সুষ্ঠু সমন্বয় হওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগঠনের কর্মীদের সঠিক কার্যনীতি, উপযুক্ত কার্যপরিবেশ, সুষ্ঠু প্রণোদোনা ও অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধার সুব্যবস্থা করা সম্ভব, যার ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সহজতর হয়ে যায়।
সংগঠনে আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ ব্যবহার (Use of modern technology and equipement in an organization):
বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে প্রতিনিয়তই উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল। নতুন নতুন এই প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়েই প্রতিষ্ঠানকে তার উদ্দেশ্য অর্জনে সচেষ্ট হতে হয়।
তবে শুধু উন্নত প্রযুক্তি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয় বরং এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানব-সম্পদ যারা কিনা নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সঠিক ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।
সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ (Prpoer utilization and maintenance of resoures) :
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী ছাড়া সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ সম্ভব নয়। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনীই জানে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের আধুনিক যন্ত্রাপাতি ও অন্যান্য সম্পদসমূহের সর্বোত্তম ব্যবহার ও সুষ্ঠু রক্ষনাবেক্ষণ করা সম্ভব। আর এরূপ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই ।
প্রতিযোগিতা মোকাবিলা (Face the Competition):
বিশ্বায়নের এই যুগে মুক্ত বাজার অর্থনীতির কারণে স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের পন্য ও সেবাদান প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কারণ কেবল মানব সম্পদ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ, এদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন এবং সংরক্ষণ করা সম্ভব।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি (Developing Skilled Manpower):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান কাজ হলো শ্রমিক কর্মীদের দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, পরিকল্পনা, নীতি ও কর্মসূচির সাথে সঙ্গতি রেখে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা ।
উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও অধিক মুনাফা অর্জন (Reduce production cost and earn maximum profit) :
প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে হলে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা খুবই জরুরি, আর এই কাজটাই করা সম্ভব যদি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি থাকে। কারণ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তিই পারে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে।
সৌহার্দ্যপূর্ণ শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক সৃষ্টি (Creating good labor management relationship):
প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের চাকাকে সচল রাখতে এবং উপযুক্ত কার্যপরিবেশ সৃষ্টি করতে গেলে সৌহার্দ্যপূর্ণ শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মীদের ন্যায্য ও যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ- সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকের মধ্যে সু-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানব-সম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (Formulating HR Planning and Implementing):
প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদের সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও যথাযথ বাস্তবায়ন খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কারণ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাই পারে সংগঠনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীবাহিনী গঠন এবং তাদেরকে সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পদায়ন করে প্রতিষ্ঠানকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিতে।
কর্মী প্রেষণা নিশ্চিতকরণ (Ensure Employee Motivation ) :
প্রেষণা কর্মীদের সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত করে এবং কর্মীর কাজে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। প্রেষণা দুই ধরনের হতে পারে। আর্থিক ও অনার্থিক প্রেষণা। কর্মীদের কাজে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও অনার্থিক এই দুই প্রকারেরই প্রেষণার ব্যবস্থা করে থাকে ।
কার্য সন্তুষ্টি অর্জন (Achieve Job Satisfication) :
প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাজের মান উন্নয়ন এবং কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখতে হলে কর্মীদের মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি তৈরি করা খুবই প্রয়োজন। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি, ন্যায্য ও যথাযথ প্রণোদনাদান এবং প্রয়োজনীয় কার্যোদ্যোগ সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মীদের কার্যসন্তুষ্টি অর্জন ও স্বতঃস্ফুর্তভাবে কাজে আত্মনিয়োগ করায় অনুপ্রাণিত করে ।

শ্রমিক-কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি (Enhance the Morale of the Employee):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা শুধু প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ ও নির্বাচন করেনা বরং কর্মীদের প্রেষণা প্রদানের মাধ্যমে কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে তাদের শতভাগ মনোবল তৈরিতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের গতিশীলতা বাড়াতে কর্মীবাহিনীর অটুট মনোবলের খুবই প্রয়োজন। উচ্চ ও ও অটুট মনোবলসম্পন্ন কর্মীবাহিনী দ্বারা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সহজতর হয়।
