মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ [ Features of Human Resource Management ] – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা” বিষয়ে একটি পাঠ।
Table of Contents
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ
[ Features of Human Resource Management ]
![মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ 2 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ [ Features of Human Resource Management ]](https://hrmgoln.com/wp-content/uploads/2022/04/Man-Model-HRM-Gurukul-GOLN-2-275x300.jpg)
কার্যকর কর্মীদল গঠনে সম্ভাব্য কর্মীদের আকৃষ্টকরণ, নিয়োগদান, উন্নয়নসাধন এবং সংরক্ষণের জন্য পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কতকগুলো সাংগঠনিক কাজের সমষ্টিই হলো মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী নিয়োগ, উন্নয়ন, বদলি, পদোন্নতি, বেতন ও মজুরি প্রদান ইত্যাদি নানান বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ :
সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অংশ হলেও এ ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। নিম্নে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার এ সকল বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:
১. সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ (Intregrated part of overall management):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাংগঠনিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে যে সকল ভাগে ভাগ করা হয়, তাদের মধ্যে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা অন্যতম। ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় মানব সম্পদ সংগ্রহ, নির্বাচন, উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের সাথে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা জড়িত থাকে। বর্তমানে সারা বিশ্বেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে পরিগনিত হচ্ছে।
২. জনশক্তির ব্যবস্থাপনা (Management of manpower):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে জনশক্তির ব্যবস্থাপনাও বলা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জনশক্তি সংগ্রহ, নির্বাচন, প্রশিক্ষণদান, উন্নয়ন, সংরক্ষণ, কর্মীদের পেশাগত মানোন্নয়ন ইত্যাদি কাজে এ ব্যবস্থাপনা নিজেকে জড়িয়ে রাখে। প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারি, তত্ত্বাবধায়ক, ব্যবস্থাপক, বিভাগীয় প্রধানসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের দক্ষতা ও পেশাগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
৩. ধারাবাহিক প্রক্রিয়া (Continuous process):
সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ন্যায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাও কতকগুলো ধারাবাহিক কাজের সমষ্টি। কর্মী সংগ্রহ, নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, বদলি, প্রেষণাদান, পদোন্নতি, অবসর বা ছাঁটাই ইত্যাদি কাজের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এ ব্যবস্থাপনার সকল কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পাদিত হয়। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা তার লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়।

৪. গতিশীল কাজ (Dynamic functions):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা একটি গতিশীল কাজ। এ ব্যবস্থাপনা কোনো সাময়িক কাজ নয়। কর্মীদের মানোন্নয়নে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কর্মীদের কার্য সম্পাদনে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ। তাছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি, পরিকল্পনা, কর্মসূচি ইত্যাদির সংশোধনও এ ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়।
৫. সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসরণ (Follow of specific rules and regulation):
ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট জ্ঞানের শাখা হিসেবে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতে হয়। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার এ সকল নিয়ম-নীতি ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা নির্দিষ্ট করে দেয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত এ সকল নিয়ম-নীতির আওতায় থেকেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সকল কাজ সম্পাদন করতে হয়। তবে নিয়ম-নীতি প্রণয়নেও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. সার্বজনীন কাজ (Universal work):
যে কাজগুলো সকল প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা সম্ভব সে সকল কাজকে সার্বজনীন কাজ বলে। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা যে সকল কাজ সম্পাদন করে তা সকল প্রতিষ্ঠানেই প্রয়োগ সম্ভব। মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে এ ব্যবস্থাপনা যে কাজগুলো সম্পাদন করে তা সকল অবস্থায় ও সকল প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, নীতি, ঊর্ধ্বতনদের মনোভাব ইত্যাদির আলোকে এর কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

৭. কৌশলগত ধারণা (Strategic approach):
কৌশলগত ধারণা থেকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উৎপত্তি। সাংগঠনিক উন্নয়নের জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে একটি কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়। এরূপ কৌশলের অংশ হিসেবে মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য নীতি প্রণয়ন, কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের যাবতীয় কার্যক্রম এ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে। আবার সাংগঠনিক কৌশল পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার যাবতীয় কাজকে পুনর্বিন্যাস করাও এ ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়।
৮. ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় (Coordination between person and organization):
ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয়সাধন করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়। প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা আসে বেতন-ভাতা প্রাপ্তির প্রত্যাশায়, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন। ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এ লক্ষ্য বিপরীতমুখী। তাই এ দু’টি লক্ষ্যকে অবশ্যই সমন্বয় করা প্রয়োজন। ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় করে বৃহত্তর স্বার্থে তা একই জায়গায় নিয়ে আসাই হলো মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
৯. মানব সম্পদের উন্নয়ন (Development of human resource):
প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানব সম্পদের উন্নয়ন সাধন করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ। মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য মানব সম্পদ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে কর্মী উন্নয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাবলি এ ব্যবস্থাপনাকে সম্পাদন করতে হয়। তাই বলা যায়, মানব সম্পদের উন্নয়ন করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১০. ভবিষ্যৎমুখী (Future oriented):
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- এটি একটি ভবিষ্যৎমুখী প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের মানোন্নয়ন করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ। এ লক্ষ্যেকে সামনে রেখে দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে। ভবিষ্যতে একটি সংগঠনে কি পরিমাণ কর্মীর প্রয়োজন হবে, তাদের দক্ষতা কিরূপ হবে, তাদের বেতন কাঠামো কিরূপ হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়েই মূলত মানব সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম আবর্তিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো। লক্ষ করা যায়। এ সকল বৈশিষ্ট্যের আলোকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে অন্যান্য যে কোনো ব্যবস্থাপনা হতে সহজেই পৃথক করা সম্ভব হয়। সে কারণেই বর্তমানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে জ্ঞানের একটি পৃথক শাখা। হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
