মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

 

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

 

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের মানবিক উপাদানের সাথে সম্পৃক্ত। মানবিক উপাদানই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকা শক্তি বা প্রাণকেন্দ্র। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যার্জনে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন কাজের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকতে হয়। আর এই কাজগুলোর সমষ্টিই হলো মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া ।

S.P. Robbins Coulter 4, “Human resource management process are the activities necessary for staffing the organization and sustaining higher employee performance.” অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংস্থানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ এবং কর্মীকে উচ্চ কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে নিয়োজিত রাখার প্রক্রিয়াকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া বলে ।

এই উক্তিটি থেকেই বোঝা যায় যে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া কতকগুলো কার্য বা উপাদানের সমন্বিত রূপ। যার সঠিক ও যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে সংগঠনের কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মী সংরক্ষণ পর্যন্ত যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয়।
নিচে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধাপসমূহ পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো:

মানবসম্পদ পরিকল্পনা (HR Planning) :

পরিকল্পনা মানে ভবিষ্যতে কী হবে তার অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ। প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রকৃতি ও পরিমাণের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কী ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন কত সংখ্যক কর্মী, কেন এবং কখন প্রয়োজন তা নির্ধারণের জন্য অগ্রিম পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে মানব সম্পদ পরিকল্পনা বলে। মানব সম্পদ পরিকল্পনা সঠিক কর্মীকে সঠিক সময়ে সঠিক কাজে নিয়োগ করতে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সহায়তা করে ।

কর্মী সংগ্রহ (Recruitment) :

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে কর্মী সংগ্রহ। প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদ বা সৃষ্টপদ পূরণের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে সম্ভাবনাময় কর্মীর অনুসন্ধান করা এবং তাদের চাকরির জন্য আবেদন করতে অনুপ্রাণিত করাকে কর্মী সংগ্রহ বলে। কর্মী অনুসন্ধানের উৎস দুই ধরনের হতে পারে (১) অভ্যন্তরীণ (2) বাহ্যিক। প্রতিষ্ঠান এই দুই ধরনের উৎস থেকেই কর্মী-সংগ্রহ করতে পারে ।

কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগদান (Selection & Appoinment of Employees):

এটি মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার তৃতীয় ধাপ। এই ধাপে এসে সংগৃহীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মীকে বাছাই করা হয় এবং নিয়োগদান করা হয়। এটি একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়া। কারণ মানব সম্পদ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হয়।

পরিচিতি ও সামাজিকীকরণ (Orientation & Socialization) :

এটি মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার চতুর্থ ধাপ। এই ধাপে মূলত নির্বাচিত এবং নিয়োগকৃত কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের কাজের উপযোগী করে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিবেশ, যন্ত্রপাতি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সহকর্মী ও অন্যান্য কর্মীদের সাথে পরিচিত করানো হয়। আর এটাই হচ্ছে সামাজিকীকরণ।

অতএব সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন নিয়োগকৃত কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের রীতিনীতি সম্পর্কে জানানো হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

 

প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন (Training and Development) :

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার পঞ্চম ধাপ হচ্ছে কর্মী প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন। এই ধাপে এসে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরা হয়। প্রশিক্ষনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদনের জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পুরানো কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য গড়ে তোলা ।

কার্য সম্পাদন মূল্যায়ন (Performence Evaluation):

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার ষষ্ঠ স্তরে এসে কর্মীদের কার্য সম্পাদন মূল্যায়ন বা কর্মী মূল্যায়ন করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত কর্মীদের অবদানের প্রেক্ষিতে তার আপেক্ষিক মূল্য নিরূপন করাই কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন বা কর্মী মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সে কতটুকু দক্ষতার সাথে সম্পাদন করছে তার আপেক্ষিক মূল নিরূপনের প্রক্রিয়াকে কার্য সম্পাদন মূল্যায়ন বা কর্মী মূল্যায়ন বলা হয়ে থাকে ।

ক্যারিয়ার উন্নয়ন (Carrer Development) :

ক্যারিয়ার উন্নয়ন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সপ্তম ধাপ। ক্যারিয়ার হচ্ছে কার্যসম্পর্কিত অভিজ্ঞতার কাঠামো যা কোনো ব্যক্তির জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ব্যাপী বিস্তৃত। ক্যারিয়ার উন্নয়ন বলতে মূলত কর্মীর পেশাগত উন্নতিকেই বুঝানো হয়।

ক্ষতিপূরণ বা আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান:

এটি মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার অষ্টম ধাপ। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানব সম্পদ বা কর্মীরা তাদের দৈহিক ও মানসিক শ্রম বা সেবা প্রদানের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক তথা বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে, তাকে ক্ষতিপূরণ বলা হয়। ন্যায্য ও যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা কর্মীদের কার্যসম্পাদন ও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন ঘটায়, কর্মীর কাজের প্রতি আনুগত্য ও মনোবল বৃদ্ধি করে,

শ্রম- ঘূর্ণায়মানতার হার হ্রাস করে এবং কর্মীর কাজে অনুপস্থিতি ও অবসন্নতা দূর করার ক্ষেত্রে কার্যকারি ভূমিকা পালন করে। ক্ষতিপূরণ প্রশাসন কর্মীদের মজুরি, বেতন, বোনাস, মুনাফা, পেনশন স্বাস্থ্যবিমা ও চিকিৎসাভাতা ইত্যাদি নির্ধারণসংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত।

শৃঙ্খলা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যরক্ষা (Discipline, Security and Health):

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার নবম ধাপ হচ্ছে কর্মী শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা করা। এই ধাপে এসে কর্মরত কর্মীদের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

 

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

 

সৌহাদ্যপূর্ণ শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক (Good labor management relationship):

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার দশম ও শেষ ধাপ হচ্ছে শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন। সৌহাদ্যপূর্ণ শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রতিষ্ঠানে বিধিবিধান বা সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যদি শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক ভালো না হয় তবে সেই প্রতিষ্ঠানের কার্যোপযোগী পরিবেশ থাকে না।

Leave a Comment