মজুরির তত্ত্বসমূহ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় মজুরির তত্ত্বসমূহ

মজুরির তত্ত্বসমূহ

 

মজুরির তত্ত্বসমূহ

 

মজুরির তত্ত্বসমূহ

একটি দেশের সরকারের নীতি, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, শ্রমিকসংঘের প্রভাব, বাজারে দ্রব্যমূল্যের অবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে মজুরির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। মজুরিসংক্রান্ত কতগুলো তত্ত্বের প্রচলন রয়েছে যেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-

জীবনধারণোপযোগী মজুরি (Sustainable wage thory):

ডেভিড রিকর্ডো ও অন্যান্য ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণ এই মজুরি তত্ত্বের প্রবক্তা বা উদ্ভাবক। তাদের মতে, জীবনধারণের স্তরের ঊর্ধ্বে মজুরি নির্ধারণ করা হলে জন্মহার বৃদ্ধি পাবে যা শ্রমিক সরবরাহ হার বৃদ্ধি এবং মজুরি হার হ্রাস করবে। তবে শিল্পোন্নয়নের ফলে শ্রমিকদের অধিক চাহিদা ও উচ্চ মজুরির বিষয়টি এই তত্ত্বে বিবেচনা করা হয়নি। এছাড়াও উচ্চতর মজুরি শ্রমিক-কর্মীদের সচেতনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয় তা এই তত্ত্বে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

জীবনযাত্রার মান তত্ত্ব (Standard of living theory) :

জীবনধারণোপযোগী মজুরি তত্ত্বের উন্নতর রূপ হচ্ছে জীবনযাত্রার মান তত্ত্ব। এই তত্ত্ব মূলত গুরুত্ব আরোপ করেছে একজন শ্রমিকের নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে বসবাসের নিমিত্তে ব্যয় অনুযায়ী মুজুরির পরিমাণ নির্ধারণের ওপর। এই তত্ত্বের মতে জনসংখ্যা ও শ্রমিক-কর্মী সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে মজুরির পরিমাণ নির্ধারণের নেগেটিভ অথবা বিপরীতমুখী সম্পর্কে কাজ করে।

অর্থাৎ, এই তত্ত্ব অনুযায়ী জনসংখ্যা ও শ্রমিক-কর্মী সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে মজুরির পরিমাণ কমে আসবে। আবার জনসংখ্যা ও শ্রমিক-কর্মী সরবরাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

মজুরি তহবিল তত্ত্ব (Wages fund theory):

জন স্টুয়ার্ড মিল এই তত্ত্বের প্রবর্তক। তিনি মনে করেন যে, একটি দেশের শিল্প বিনিয়োগের লক্ষ্যে মূলধনের একটি অংশ মজুরি পরিশোধের জন্য রাখা উচিত। শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক- কর্মী সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে মজুরি হ্রাস পায়। শিল্প মালিকগণ মজুরির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দ্বারা কাঁচামালের মূল্য পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর সুযোগ পায় ।

মজুরি দরকষাকষি তত্ত্ব (Bargaining theory of wage):

মজুরি দরকষাকষি তত্ত্ব প্রদান করেন জন ডেভিসন। তিনি মনে করেন শ্রমিক ও মালিকের যৌথদরকষাকষির মাধ্যমে মজুরির স্তর নির্ধারিত হয়। একটি দেশের প্রচলিত আইনের বিধানসমূহ এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা শ্রমিক ও মালিকের দরকষাকষির ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

 

অবশিষ্ট দাবিদার তত্ত্ব (Residual claimant theory) :

ফ্রান্সিস এ ওয়াকার এই তত্ত্বের প্রবর্তক। তাদের মতে পণ্য উৎপাদনে সকল উপাদানেরই কম বেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে। জমির অংশে রয়েছে খাজনা, মূলধনের অংশে সুদ, কর্মীর অংশে মজুরি এবং মালিকের অংশে রয়েছে মুনাফা। শ্রমিক- কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে। আর এর ফলে শ্রমিক-কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধি পাবে, তবে অন্যান্য উপাদানগুলোর মূল্য (খাজনা, সুদ ও মুনাফা) অপরিবর্তিত থাকতে হবে।

প্রন্তিক উৎপাদন তত্ত্ব (Marginal productivity theroy):

জন ব্যাটস ক্লার্ক এই তত্ত্বের প্রবর্তক । এই তত্ত্ব অনুযায়ী পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মজুরি প্রান্তিক উৎপাদনের সমান হবে। শ্রমিকদের চাহিদা উৎপাদনশীলতার আলোকে নির্ধারণ হয়ে থাকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মীর সরবরাহ সীমিত এবং সকল শ্রমিক-কর্মীদের সমান দক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাছাড়া পূর্বানুমান করা যায় যে যদি প্রান্তিক উৎপাদন মজুরির চেয়ে বেশি হয় তাহলে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ পাবে। অতএব প্রান্তিক উৎপাদন ও মজুরি সমান হওয়া প্রয়োজন।

বাট্টাকৃত প্রান্তিক উৎপাদন তত্ত্ব (Discounted marginal productivity theory):

এই তত্ত্বের প্রবর্তন করেন Professor Tousig. এই তত্ত্ব অনুযায়ী মজুরি প্রান্তিক উৎপাদনের সমান হবে না বরং পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মজুরি পরিশোধ করতে হবে। অতএব উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত মজুরি বলতে প্রান্তিক উৎপাদন থেকে মজুরি বাবদ সুদ বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে বুঝাবে ।

 

মজুরির তত্ত্বসমূহ

 

মজুরির চাহিদা ও জোগান তত্ত্ব (Demand and supply theory of wages) :

কর্মী ও মজুরির প্রান্তিক উৎপাদনের মধ্যকার পার্থক্য এর ওপর কর্মীর চাহিদা ও যোগান নির্ভর করে। যে স্তরে শ্রমিক-কর্মীর চাহিদা ও যোগান একে অপরকে ছেদ করে সেখানে মজুরি নির্ধারিত হয় এবং একে ভারসাম্য মজুরি বলা হয়। যদি শ্রমিকের মজুরি ভারসাম্য মজুরি হারের চেয়ে বেশি হয় তবে শ্রমিক জোগান বৃদ্ধি পাবে। যদি শ্রমিক সরবরাহ বা জোগান বৃদ্ধি পায় তবে শ্রমিকদের মজুরীর পরিমান ক্রমশ হ্রাস পায়।

Leave a Comment