আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বেতন ও পারিশ্রমিক সম্পর্কিত মূল আইনসমূহ। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ৮ এর অন্তর্গত।
বেতন ও পারিশ্রমিক সম্পর্কিত মূল আইনসমূহ

বেতন ও পারিশ্রমিক সম্পর্কিত মূল আইনসমূহকে ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে । যেমন:
i. পারিশ্রমিক ও শ্রমঘণ্টা আইন;
ii. শ্রমিক কর্মীদের পেনশন ও শ্রমকল্যাণ সংক্রান্ত আইন;
iii. আয়কর সংক্রান্ত আইন; এবং
iv. নিয়োগে বৈষম্য নিরোধ সম্পর্কিত আইন ।
i. পারিশ্রমিক ও শ্রমঘণ্টা আইন (Wages and labour hour legislation) : পারিশ্রমিক ও শ্রমঘণ্টার আন্দোলন শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। এই আন্দোলনের ফলে বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকেরা ন্যায্য পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে ।
ii. শ্রমিক কর্মীদের পেনশন ও শ্রমকল্যাণ সংক্রান্ত আইন (Pension and labour welfare legislation) : কর্মীদের পেনশন ও কল্যাণ অত্যন্ত আবশ্যক। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালে পেনশন ও শ্রমকল্যাণ আইন পাস করা হয়।
iii. আয়কর সংক্রান্ত আইন (Tax treatment legislation) : আয়কর পরিশোধ ব্যবস্থা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শ্রমিক, কর্মী, কর্মকর্তা, নিয়োগকর্তা সকলকে আয়কর প্রদান করতে হয়। তা না হলে তারা কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে না ।
iv. নিয়োগে বৈষম্য নিরোধ সম্পর্কিত আইন (Antidiscrimination in employment legislation) : শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মীদের মাঝে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। তাই এই বৈষম্য রোধ করার জন্য বৈষম্য নিরোধ আইন পাস করা হয়।
উল্লিখিত আইনসমূহের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো :
পারিশ্রমিক ও শ্রমঘণ্টা আইন (Wages and labour hour legislation) : উনিশ শতকের শুরুতে উন্নত কর্মপরিবেশ, সপ্তাহে কম শ্রমঘণ্টা, সপ্তাহে কম কর্মদিবস, ভালো পরিশোধ ব্যবস্থা ইত্যাদি দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। ১৮৪০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মান্টিন ভ্যান বিউরেন (Martin Van Buren) একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন যাতে প্রতিদিন শ্রমঘণ্টা ১০ শ্রমঘণ্টা কথা বলা হয়েছিল।
আর তখন প্রতিদিন ১৩ শ্রমঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হতো। ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত তা চলে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের জীবনধারণের অভ্যস্ততার জন্য শ্রমঘণ্টা ৮ ও ১২ যুগপৎ ১৯২০ সাল পর্যন্ত চলে। বোস্টনের একজন যন্ত্রবিদ (Machinist) ইরা স্টিওয়ার্ড (Ira Steward) দিনে ৮ শ্রমঘণ্টা করার দার্শনিক ভিত্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন যে, শ্রমিকদের অভ্যাস ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নত মানের প্রযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করিয়েই উদ্বৃত্ত অর্জন করা সম্ভব। এতে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়বে। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র (সকল অঙ্গরাজ্যে) দিনে ৮ শ্রমঘণ্টা কাজের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়,
যা ১৯২০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। তবে সেখানে শ্রমিকদের জীবনধারণের পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ৮ ঘণ্টা ও ১২ ঘণ্টা উভয়টি চালু ছিল। যাই হোক, ১৯৯৬ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে “ন্যূনতম পারিশ্রমিক আইন” (Minimum wages legislation) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়।
এগুলো আরও জোরালো হয় David Ricardo কর্তৃক “পারিশ্রমিকের লৌহ আইন (Iron law of wages) প্রকাশের পর এটি ১৮১৭ সালে প্রকাশ করা হয়। এ তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, শ্রমিকের প্রাকৃতিক মূল্য হলো সেই মূল্য যা শ্রমিককে অন্যের সাথে বাঁচতে সক্ষম করে তোলে।” (The natural price of labour is that price which is necessary to enable the labour one with another submit.)
তবে ১৯০৫ সালে আমেরিকার বেকারি শ্রমিকদের জন্য সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে আইন করা হয়। এ সময়ে “স্বাধীনতা চুক্তি” (Liberty of contract) আত্মপ্রকাশ করে। এটি হলো শ্রমিকদের এক ধরনের অধিকার, যার প্রেক্ষিতে শ্রমিক তার সেবাকে বিক্রি করতে পারে। (The right of an employee to sell his other services.)
সকল ধরনের শ্রমঘণ্টা বা ন্যূনতম পারিশ্রমিক বিতর্ক দারুণভাবে প্রভাবিত হয় ১৯১৩ সালে যখন আমেরিকার বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ফোর্ড-এর মালিক হেনরি ফোর্ড (Henry Ford) দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করার বিধান চালু করেন এবং কাজের সংযুক্ত লাইন পদ্ধতি (Conveyor assembly line) যুক্ত করেন।
এ সময় লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের শ্রমিক-কর্মীরা সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করেন। ১৯২৩ সালে Liberty of contract নতুনভাবে আসে। তা হলো- নারী ও শিশুদের জন্য স্থায়ী ন্যূনতম পারিশ্রমিক চালু করা হয়। ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসে Fair labour standards Act (FLSA) পাস করা হয়। এটি আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী পারিশ্রমিক ও শ্রমঘণ্টা আইন হিসেবে প্রচলিত আছে।
তবে এ আইনে নিচের কয়েকটি দলের জন্য ন্যূনতম পারিশ্রমিকের চেয়েও কম পারিশ্রমিক দেওয়ার বিধান রাখে। যেমন:
i. আধাদক্ষ পেশায় শিক্ষার্থীদের জন্য;
ii.দক্ষ পেশায় শিক্ষানবিশদের জন্য;
iii. চিঠিপত্র ও সংবাদ বিলিকারকদের জন্য;
iv. যারা সংরক্ষিত ওয়ার্কশপে কাজ করে এমন অসমর্থ ব্যক্তি এবং অসমর্থ ব্যক্তি (Handicapped);
V. উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য।

