আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৌশলগত পরিকল্পনা ও কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সংযুক্তকরণ প্রক্রিয়া। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১০ এর অন্তর্গত।
কৌশলগত পরিকল্পনা ও কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সংযুক্তকরণ প্রক্রিয়া
কৌশলগত পরিকল্পনা যে সব সময় কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় ফলপ্রসূভাবে কাজ করবে তার নিশ্চয়তা নেই ৷ অথচ বহু প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার ঘণ্টা কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যয় করে যার দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের মিশন ও ভিশন তৈরিতে অনেক সময় ব্যয় করে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া বা প্রতিফলন কার্যক্রম বিবেচনা না করেই।
ফলশ্রুতিতে অনেক সময় নষ্ট করে দিয়ে কার্যক্রমটি শেষ হয় এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য কর্মীদের হতাশা তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ভারতের আটটি সেক্টরের ৩৫০ জন কর্মীর উপর জরিপ চালানো হয়। ফলাফলে দেখা যায় যে, প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানেই ভালো কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়া ছিল; কিন্তু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিক পর্যায়ের লক্ষ্যের মধ্যে সম্পর্ক ছিল না।
যখন এটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে, ঐ ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে তখন ব্যক্তিক কার্যসম্পাদনের সাথে কৌশলগত পরিকল্পনার সংযোগ তৈরি করতে হবে সতর্কতার সাথে । চিত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পরিকল্পনা, ইউনিটের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ব্যক্তি ও দলের কার্যসম্পাদনের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা যায়। নিচে এ চিত্রটি দেখানো হলো:

চিত্র : প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের কৌশলগত পরিকল্পনা, কার্য বর্ণনা এবং ব্যক্তি ও দলের কার্যসম্পাদনের মধ্যে সংযোগসাধন
চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মিশন ও ভিশনের বর্ণনা, আরও আছে লক্ষ্য ও কৌশলসমূহ। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কৌশলসমূহ ঠিক করা হয়। যত বেশি সম্পৃক্ততা, কৌশলের তত বেশি সফলতা নিশ্চিত করতে পারেন ব্যবস্থাপকগণ।
প্রতিষ্ঠানের কৌশলসমূহ নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপকগণ বিভাগ বা ইউনিটের সকলের সাথে মিলিত হন এবং তাদের সাথে পরামর্শক্রমে ইউনিটের মিশন ভিশন ঠিক করেন যা প্রতিষ্ঠানের মিশন, ভিশন, লক্ষ্য ও কৌশলের সাথে মিল রেখে করা হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অত:পর ইউনিট ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে কার্য বর্ণনা সংশোধন করা হয়।
চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা যায় যে, কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে ফলাফল, আচরণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা প্রতিষ্ঠান, বিভাগ পর্যায়ের ও ব্যক্তিক কার্য বর্ণনার সাথে মিল রেখে করা হয় । এখন দেখার বিষয় যে, প্রতিষ্ঠান, ইউনিট এবং ব্যক্তির মধ্যে সংযোগ প্রক্রিয়া কতটুকু কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি অবশ্যই কার্যকর এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে প্রমাণও রয়েছে।
কৌশলকে কার্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ৪২টি দেশের ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, কৌশলগত পরিকল্পনাকে সফল করার ক্ষেত্রে কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা হলো তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি অবশ্য বড় প্রতিষ্ঠান এবং যে সকল প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনশীল পরিবেশে কাজ করে তাদের জন্য অতি সত্য ও বাস্তব।
উপরে বর্ণিত সিস্টেমের পক্ষে আমেরিকার একটি প্রধান ব্যাংকের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকটির নাম Key Bank of Utah (কি ব্যাংক অব ইউতাহ) । এ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করে সফলতার সাথে কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেম প্রবর্তন করে। এটি করতে গিয়ে প্রথমেই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠানের মিশন বিবৃতি (Mision Statement) তৈরি করার জন্য সকল স্তরের ব্যবস্থাপকদেরকে সম্পৃক্ত করে।
এউপর তারা লক্ষ্য ও কৌশল প্রণয়ন করেন যা মিশন বিবৃতি অর্জনে সাহায্য করে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের মিশন বিবৃতি, লক্ষ্য ও কৌশলসমূহ প্রতিটি বিভাগ ও ইউনিটের কৌশল প্রবর্তনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এ সকল কৌশল প্রবর্তনের জন্য উচ্চতর ব্যবস্থাপকগণ প্রতিটি বিভাগের ব্যবস্থাপকদের সাথে সাক্ষাৎ করত: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
একইভাবে প্রতিটি বিভাগের ব্যবস্থাপকগণ তাদের কর্মীদের সাথে বসে বিভাগের মিশন বিবৃতি ও লক্ষ্য ঠিক করে নেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: প্রতিটি বিভাগের মিশন বিবৃতি, উদ্দেশ্য, প্রতিষ্ঠানের মিশন বিবৃতি, লক্ষ্য ও কৌশলের সাথে মিল রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও বিভাগীয় লক্ষ্য, কৌশলসমূহ সংযুক্তকরণের পর ব্যবস্থাপক ও কর্মীবৃন্দ ব্যক্তিক কার্য বর্ণনা পুনর্বিন্যাস করেন।
প্রতিটি কার্য বর্ণনা এমনভাবে করা হয়েছে যেন প্রত্যেকের কার্যের দায়-দায়িত্ব পরিষ্কার হয়ে যায় এবং বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যার্জনে অবদান রাখতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় কর্মীদেরকে সম্পৃক্ত করায় তারা বুঝতে পারে যে, তাদের কার্যসম্পাদন কীভাবে বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে। চূড়ান্তভাবে, চিহ্নিত প্রধান প্রধান দায়িত্বের উপর ভিত্তি করে কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে আচরণ, ফলাফল ও উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
Key Bank of Utah কর্তৃক এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের ফলে কী ঘটেছে? সাধারণভাবে বলতে গেলে- ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠান, বিভাগীয় ও ব্যক্তিক লক্ষ্যকে সংযুক্তকরণের ফলে বিভিন্ন ধরনের অনুকূল ফলাফল পেতে সক্ষম হয়েছে। নতুন কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেম বাস্তবায়নের পর ব্যাংকটি বিভিন্ন ধরনের অর্থপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে, যেমন:
- ব্যবস্থাপকগণ জানতো যে কর্মীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যার্জনের বিষয়টি আলোকপাত করা হয়েছে।
- কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
- নিচু স্তরের ব্যবস্থাপকদের উঁচু স্তরের ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে।
- ব্যবস্থাপক, উচ্চ পর্যায় ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের মধ্যে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে।
নিচে চিত্রের মাধ্যমে Key Bank of Utah -এর কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পরিকল্পনার সংযুক্তকরণ দেখানো হলো:

চিত্র: কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পরিকল্পনার মধ্যে সংযুক্তকরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
পরিশেষে বলা যায় যে, প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হলে কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমকে কৌশলগত ব্যবস্থাপনার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। প্রতিটি কর্মীর আচরণ, ফলাফল ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে প্রতিষ্ঠানের এবং এর ইউনিট সমূহের ভিশন, মিশন, লক্ষ্য ও কৌশলের সাথে সমন্বয় করতে হবে। এ ধরনের সমন্বয় করা হলে প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ফল প্রত্যাশা করতে পারে।
