মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ [ Principles of Human Resource Management] নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা” বিষয়ে একটি পাঠ।

Table of Contents

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ | মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ [ Principles of Human Resource Management] নীতি হলো সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এমন কোনো বিবৃতি যা কার্য সম্পাদনের নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। (A principle can be defined as a fundamental statement or truth providing a guide to though or action) নীতির বৈশিষ্ট্য হলো স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এরূপ নির্দেশিকার সফল প্রয়োগে যথার্থ ফল প্রাপ্তির নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা যেহেতু মৌলিক বিজ্ঞান নয়, তাই এর সফলতার জন্য বেশকিছু নীতিকে অনুসরণ করা হয়।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ :

নিম্নে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ আলোচনা করা হলো:

১. উত্তম পরিকল্পনার নীতি (Principle of unique plan):

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা যেহেতু কর্মীদের ভবিষ্যৎ চাহি, প্রত্যাশা, কর্মদক্ষতা, উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে, তাই এ ব্যবস্থাপনাকে মানব সম্পদের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। পরিকল্পনা যত উত্তম ও বাস্তবসম্মত হবে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যও তত দ্রুত অর্জিত হবে। তাই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে উত্তম পরিকল্পনার নীতি অনুসরণ করা উচিত।

 

২. বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কর্মী নির্বাচনের নীতি (Principle of scientific selection):

কর্মী নির্বাচন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ হিসেবে গণ্য হয়। তবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্য কর্মী নির্বাচন অত সহজ বিষয় নয়। কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। কর্মী নির্বাচনের নীতি যত সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত হবে নির্বাচন প্রক্রিয়া ততই সন্দেহমুক্ত ও সবার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে। তাই কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ ঘটানো উচিত।

 

৩. শ্রম মর্যাদার নীতি (Principle of dignity of labor):

শ্রম মর্যাদার নীতি মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্যতম নীতি হিসেবে গণ্য হয়। এ নীতির আওতায় কোনো কর্মীর কাজকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ছোট-বড় সকল কর্মীর কাজের সামষ্টিক ফসলই হলো প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে সকল কর্মীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

 

Man Model HRM Gurukul GOLN 17 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

 

৪. উচ্চ মনোবলের নীতি (Principle of high morale):

মনোবল হলো মানসিক দৃঢ়তা। উচ্চ মনোবল সম্পন্ন কর্মীদের দিয়ে অতিসহজেই চ্যালেঞ্জমূলক কার্য সম্পাদন করা যায়। তাই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মীদের উচ্চ মনোবল সৃষ্টির জন্য চেষ্টা চালায়। এ নীতির আওতায় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের মনোবল উচ্চ করার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কর্মীদের মাঝে উচ্চ মনোবল সৃষ্টি করা গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

 

৫. ব্যক্তিগত উন্নয়নের নীতি (Principle of personal development):

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্যতম নীতি হলো কর্মীদের ব্যক্তিগত উন্নয়নের নীতি। এ নীতির আওতায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কর্মীদের ব্যক্তিগত উন্নয়ন একদিকে যেমন তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে অন্যদিকে এর মাধ্যমে তাদের কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পায়; যা প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

 

৬. কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের সমতা নীতি (Principle of balancing responsibility and authority):

কর্তৃত্ব হলো আদেশ প্রদানের অধিকার এবং দায়িত্ব হলো অর্পিত কার্য সম্পাদনের দায় বা কর্তব্য। মানব সম্পন ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্তৃত্ব দেওয়া হয় এবং উক্ত কাজে তাদের দায়িত্বও অর্পণ করা হয়। তবে এরূপ কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব অবশ্যই সমপরিমাণ হওয়া উচিত। অসম কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব কার্য সম্পাদনে বাধা সৃষ্টি করে।

Man Model HRM Gurukul GOLN 12 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

 

৭. পারিশ্রমিকের নীতি (Principle of remuneration):

কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিকের আশায় কর্মীরা কাজ করতে আসে। তাই দক্ষ ও যোগ্য কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার জন্য কর্মীদেরকে অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে। উপযুক্ত পারিশ্রমিক বঞ্চিত কর্মীরা নানান ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানে শ্রম-ঘূর্ণায়মানতা বৃদ্ধি পায়। এ কারণে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদানে মনোনিবেশ করা উচিত।

 

৮. দলগত প্রচেষ্টার নীতি (Principle of group efforts):

কোনো ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দলগত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। এ কারণে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সকল সময় দলগত প্রচেষ্টাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। কোনো সংগঠনে দলগত প্রচেষ্টার পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে সেখানে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয় এবং দলীয় উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন ত্বরান্বিত করে।

 

৯. নিয়মানুবর্তিতার নীতি (Principle of discipline):

প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম-নীতি এবং ঊর্ধ্বতনের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাবোধ এবং মান্য করে চলার ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রয়াসের সঙ্গে নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কযুক্ত। প্রতিষ্ঠানের সবাই যদি নিয়ম-নীতি ও সেই সাথে ঊর্ধ্বতনদের মেনে চলে তবে কখনই প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে না। এ কারণে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুবর্তিতার দিকে বিশেষ। নজর দেয়।

 

Charts with a Glowing Sector HRM Gurukul GOLN 2 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

 

১০. আদেশের ঐক্যের নীতি (Principle of unity of command):

এ নীতির মূলকথা হলো একজন কর্মী প্রত্যক্ষভাবে একজন মাত্র ঊর্ধ্বর্তনের অধীনে থাকবে। অর্থাৎ একজন কর্মী যার প্রত্যক্ষ অধীনে থাকবে তার নিকট থেকেই নির্দেশ লাভ করবে এবং কাজের রিপোর্ট ঐ ঊর্ধ্বর্তনের নিকটই প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। এ নীতির আলোকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এমনভাবে সংগঠন কাঠামো দাঁড় করায় যাতে একজন কর্মী শুধুমাত্র একজন ঊর্ধ্বতনের অধীনেই কাজ করে।

 

১১. বিশেষায়নের নীতি (Principle of specialization):

প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীরা যাতে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে পারে সে বিষয়টি বিবেচনা করে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্ম পরিকল্পনা ঠিক করেন। এ নীতির আওতায় প্রতিষ্ঠানের সকল কাজকে সম বৈশিষ্ট্যের আলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ওপর অর্পণ করা হয়। এর ফলে উক্ত ব্যক্তি একই কাজ বার বার সম্পাদন করতে করতে বিশেষজ্ঞতা অর্জন
করে।

 

১২. কার্যকর যোগাযোগের নীতি (Principle of effective communication):

বর্তমান যুগ যোগাযোগের যুগ। অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও যোগাযোগের গুরুত্ব অনেক বেশি। এ নীতির আওতায় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মীদের সাথে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতি থাকা জরুরি; যাতে প্রতিটি কর্মী ও কর্মকর্তার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়।

Man Model HRM Gurukul GOLN 14 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

 

১৩. কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের নীতি (Principle of centralization and decentralization):

যে ব্যবস্থা ঊর্ধ্বতনের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে তাই হলো কেন্দ্রীকরণ এবং যে ব্যবস্থা অধস্তনদের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে তাই হলো বিকেন্দ্রীকরণ। এ নীতির আওতায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিজের নিকট রেখে দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অধস্তনদের নিকট হস্তান্তর করে। এতে একদিকে যেমন তাদের কর্মভার লাঘব হয়, অন্যদিকে তেমনি অধস্তনদেরও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়।

 

১৪. শৃঙ্খলার নীতি (Principle of order):

এ নীতির লক্ষ্য হলো যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে এবং উপযুক্ত বস্তুকে স্থানে স্থাপন করা যাতে প্রতিষ্ঠানে মানব শৃঙ্খলা ও বস্তুগত শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয়। এছাড়াও এ নীতির আওতায় সকল বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদান যাতে প্রতিষ্ঠানে সঠিক নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথে কার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয় তারও ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এ নীতির মাধ্যমে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে প্রতিটি কর্মীর যোগ্যতা, পদ মূল্যায়ন এবং কর্মী নিয়োগে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়।

 

১৫. উদ্যোগ গ্রহণের নীতি (Principle of initiative):

প্রতিষ্ঠানের যে কোনো স্তরে কর্মরত কর্মীরা যাতে তার আওতাধীন কাজ নিয়ে যাতে ভাবতে পারে, কাজের উন্নয়ন সাধন করতে পারে ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে সে ধরনের কার্য পরিবেশ সৃষ্টি করাই এরূপ নীতির উদ্দেশ্য। এ নীতির আওতায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠনে এরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে প্রতিটি কর্মী নিজ নিজ অবস্থানে থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

 

Man Model HRM Gurukul GOLN 13 মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ

 

 

পরিশেষে বলা যায়, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপরোক্ত নীতিগুলো অনুসরণ করা উচিত। এ নীতিগুলো অনেকটাই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়ায় এ ব্যবস্থাপনাকে এ নীতিগুলো সম্পর্কে সাম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন। আলোচিত নীতিগুলোর স্বার্থক বাস্তবায়নের উপরই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে।

Leave a Comment