আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বেতন ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয়। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ৮ এর অন্তর্গত।
বেতন ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয়

পারিশ্রমিক ও বেতন (ক্ষতিপূরণ) নির্ধারণ (মানব সম্পদ) ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজ। কারণ এর উপর কর্মীর কার্য সন্তুষ্টি নির্ভর করে। পারিশ্রমিক ও বেতন নির্ধারণ কতকগুলো উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়। নিচে এ সকল উপাদান আলোচনা করা হলো :
১. চাহিদা ও সরবরাহ (Demand & Supply) : পারিশ্রমিক শ্রমিকদের জন্য কাজের প্রতিদান স্বরূপ। কোনো একটি কাজের জন্য শ্রমিক সরবরাহ কম হলে পারিশ্রমিক বেশি দেওয়া হয়। আবার কোনো সময় চাহিদার তুলনায় শ্রমিক সরবরাহ বেশি হলে পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সুতরাং কোনো একটি কাজের জন্য কী পরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, তা অনেকাংশে শ্রমিকদের চাহিদা ও সরবরাহের উপর নির্ভর করে ।
২. জীবনযাত্রা ব্যয় (Cost of living) : জীবনযাত্রার মানের উপর পারিশ্রমিকের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী পারিশ্রমিক হার নির্ধারণ করা উচিত। অন্যথায় কর্মীগণ অন্যত্র উচ্চ বেতনে চাকরি খুঁজতে ও চাকরি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হতে পারে। এছাড়া অপর্যাপ্ত পারিশ্রমিক কর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া, কোম্পানির সম্পদ চুরি, আত্মসাৎ প্রভৃতি প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
৩. দরকষাকষি করার ক্ষমতা (Power of bargaining) : যে সকল প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংঘ অথবা যৌথ দরকষাকষির প্রতিনিধি সক্রিয় সেখানে সাধারণত পারিশ্রমিকের হার বেশি হয়ে থাকে। কারণ শ্রমিক সংঘের সদস্যগণ অন্য প্রতিষ্ঠানের সমান এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধিক পারিশ্রমিক দাবি করে থাকে। শ্রমিক সংঘ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বিধায় তাদের ইচ্ছানুযায়ী বেশি পারিশ্রমিক দিতে হয়। এটিই দরকষাকষির ক্ষমতা ।
৪. প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষমতা (Financial ability of the organization) : পারিশ্রমিক প্রধানত প্রতিষ্ঠানের অর্থ প্রদান করার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। প্রতিষ্ঠানে মুনাফার পরিমাণ বেশি হলে কর্মিগণ অধিক পারিশ্রমিক পেতে পারে। আর মুনাফার পরিমাণ কম হলে প্রতিষ্ঠান স্বল্পহারে পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য হয়। সুতরাং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ভালো হলে পারিশ্রমিক বেশি করে দেওয়া হয়।
৫. উৎপাদন ক্ষমতা (Production power) : যে শ্রমিক বেশি উৎপাদন করে স্বাভাবিকভাবেই তাকে বেশি পারিশ্রমিক দিতে হয়। অপরপক্ষে, যে শ্রমিক তুলনামূলকভাবে কম এবং নিম্নমানের দ্রব্য উৎপাদন করে তাকে কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়ে থাকে । সুতরাং শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা পারিশ্রমিক হারকে প্রভাবিত করে থাকে ।
৬. আইন (Law) : আজকাল প্রতিটি দেশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ন্যূনতম পারিশ্রমিক ও ওভার টাইম, প্রিমিয়াম, পারিশ্রমিকের পরিমাণ নির্ধারণ পদ্ধতি, প্রদানের সময় ও পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয় নির্ধারণ করে থাকে। কর্মীগণ আন্দোলন করে যে পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে পারে না, সরকারের হস্তক্ষেপে তা সহজে সম্ভব হয়। সুতরাং পারিশ্রমিক নির্ধারণে দেশের প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনা করতে হয়।
৭. তুলনামূলক পারিশ্রমিক (Comparative wages) : এক প্রতিষ্ঠানের পারিশ্রমিক হার অন্য প্রতিষ্ঠানের পারিশ্রমিকের হারকে প্রভাবিত করে। সুতরাং পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার সময় সমজাতীয় কার্যের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়া হয় তাও বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় যে প্রতিষ্ঠানে পারিশ্রমিকের হার বেশি শ্রমিকগণ সেখানে চmind চলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। এতে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং শ্রম ঘূর্ণায়মানতা হ্রাস করতে হলে তুলনামূলকto ad পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে।
৮. কাজের প্রকৃতি (Nature of job) : সকল প্রকার কাজের জন্য একই হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। যেসব কাজে অধিক দক্ষতার প্রয়োজন, দায়িত্ব ও ঝুঁকি রয়েছে, সেসব কাজের জন্য অধিক হারে পারিশ্রমিক দিতে হয়। কাজের প্রকৃতির উপরও পারিশ্রমিকের হার নির্ভর করে। অর্থাৎ বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য পারিশ্রমিকের হার বেশি হয়ে থাকে।
৯. পদের আপেক্ষিক মূল্য (Relative valuation of job) : পদ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিটি কাজের আপেক্ষিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তাই বিভিন্ন পদের মূল্য বা অবদান তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা উচিত। অর্থাৎ উদ্দেশ্য অর্জনে যে পদের অবদান যত বেশি সে পদের পারিশ্রমিক তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে।
১০. চাকরি হতে প্রাপ্ত সুবিধা (Facility from job) : চাকরি হতে প্রাপ্ত সুবিধার উপরও পারিশ্রমিকের হার নির্ভর করে। যেসব চাকরিতে পদোন্নতি, বিদেশ ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, প্রভৃতি সুবিধা বেশি সেসব চাকরির পারিশ্রমিক হার অন্যান্য চাকরি হতে কিচুটা পার্থক্যমূলক হয় অর্থাৎ বেশি হয়। কারণ এ সকল ক্ষেত্রে বেশি যোগ্যতার প্রয়োজন হয় ।
১১. প্রতিযোগিতার অবস্থা (Condition of competition) : শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাজারে প্রতিযোগিতার পরিমাণ দ্বারাও পারিশ্রমিক স্তর প্রভাবিত হয়। বাজারে পূর্ণ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান থাকলে পারিশ্রমিকের পরিমাণ কম হয় । কারণ ইচ্ছে করলেই কোনো প্রতিষ্ঠান বেশি উৎপাদন করে কম মূল্যে বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারে না। ফলে পারিশ্রমিকের বাড়ানো যায় না ।
১২. কার্য সময় (Time of work) : একজন কর্মীর ‘প্রকৃত পারিশ্রমিক’ কার্য সময়ের উপরও নির্ভর করে। কার্যের সময় যত কম হয় এবং ছুটির পরিমাণ যত বেশি হয় প্রকৃত পারিশ্রমিকের পরিমাণ কম হয় । উপর্যুক্ত আলোচনা হতে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, উল্লিখিত উপাদানগুলো দ্বারা পারিশ্রমিক ও বেতন কাঠামো প্রভাবিত হয়।
তাছাড়া জাতীয় আয়স্তর ও এর বণ্টন, জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পের অবদান, রুচিপূর্ণ কাজ, অর্থের ক্রয় ক্ষমতা, আন্তঃশিল্প পারিশ্রমিকের হার প্রভৃতি উপাদান দ্বারাও পারিশ্রমিকের হার নির্ধারণ প্রভাবিত হয়ে থাকে।

