ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব ও কৌশল

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব ও কৌশল। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ৯ এর অন্তর্গত।

ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব ও কৌশল

 

ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব ও কৌশল

 

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কর্তৃক কয়েক ধরনের ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব উদ্ভাবন করা হয়েছে। এগুলো নিম্নরূপ:
১ । নৈতিক অহংবাদ (Ethical Egoism ) ২। উপযোগবাদ (Utilitarianism)
৩। সার্বিক যুক্তিবাদ (Universalism)
৪ । ন্যায় বিচার তত্ত্ব (Theory of Justice)

নিচে এগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো :

১। নৈতিক অহংবাদ (Ethical Egoism) : এ তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, মানুষের নিজের স্বার্থে কাজ করা উচিত। তবে এটিকে স্বার্থপরতার সাথে সমান করে দেখা যাবে না। এটি যতক্ষণ না অন্যের স্বার্থ নিজের উপকারে আসে, ততক্ষণ মানুষের নিজের স্বার্থেই কাজ করা উচিত। মানুষ যখন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন, এরূপ ক্ষেত্রে এ তত্ত্বটি কার্যকরী। তবে নিজ স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনের কোনো পন্থা এ ক্ষেত্রে বলা হয়নি।

এ ক্ষেত্রে অহংবাদের সাথে পরার্থবাদের তুলনা করা যায়। অহংবাদে ব্যক্তির নিজ-স্বার্থে কাজ করতে বলা হয়েছে। অপরদিকে, পরার্থবাদে সামাজিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নিজ স্বার্থে বেশি কাজ করে দেখা হয়, বড় ব্যবসায়ের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সামাজিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অহংবাদে বিশ্বাসী ব্যবস্থাপকগণ মনে করেন ব্যক্তিগত কল্যাণ সাধন করাই মুখ্য, অন্য ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন। বেতন, সম্মান, ক্ষমতা প্রভৃতি যে কোনো দিকই হোকনা কেন, ব্যক্তিক সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল করাই এ তত্ত্বে বিশ্বাসীদের মূলকথা। অপরদিক, পরার্থবাদে বিশ্বাসীদের ধ্যান-ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকগণ ভালো-মন্দ বিচারপূর্বক স্বার্থ হাসিল করেন। তবে এ পথ একটু জটিল ও কঠিন ।

২। উপযোগবাদ (Utilitarianism) : উপযোগবাদ তত্ত্বটির প্রস্তাবক হলেন ডেভিড হিউম (David Hume) । কিন্তু এটি সংজ্ঞার আকারে প্রকাশ করেন জেরিমি বেনথাম (Jeremy Bentham) ও জন স্টুয়ার্টমিল (John Stuartmill)। বেনথাম যুক্তি দেন যে, “উপযোগনীতি” (The principle of Utility) মূলত একটি নৈতিক নীতি।

এ নীতির মূলকথা হলো- যখন অনেকগুলো বিকল্প কার্য বা সামাজিক পলিসি থাকে, তখন এমনটি বেছে নিতে হবে যা সর্বদা সর্বাধিক সাধারণের উপকারে আসে। বেনথামের একজন শিষ্য ছিলেন যার নাম জেমস্ মিল (James Mill) যার পুত্র জন স্টুয়ার্ট (John Stuartmill) পরিবর্তিত “উপযোগনীতি” (The principle of Utility) তত্ত্বের অগ্রদূত হয়ে আবির্ভূত হন।

তাঁর উপযোগবাদ তত্ত্বটি এরূপ: “কী করতে হবে তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত যে কী ধরনের আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত সকল লোকদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিতে পারে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে নৈতিকতা হলো- কোটি সবচেয়ে ভালো পরিচালনা ও কার্যক্রম, যা সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।”

নৈতিক তত্ত্বে বলা হয় যে, কোনো কার্য তখনই সঠিক হবে যখন এটি দ্বারা অধিকসংখ্যক লোক উপকৃত হবে, অন্যথায় এটি ভুল কার্য হিসেবে গণ্য হবে। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, যে কার্যের ফলে অধিক পরিমাণ মুনাফা লাভ করা যায় বা অর্থের পরিমাণ বাড়ে তা-ই সঠিক বা ভালো কাজ বলে বিবেচিত হয়। আর যে কার্যের ফলে অর্থের পরিমাণ বাড়েনা, বরং কমে বা লোকসান হয়, সেই কর্ম ভুল বা খারাপ।

সুতরাং ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ বিচার হয় অর্থ দিয়ে। সুতরাং কোন কোম্পানি যৌক্তিকভাবে ভালোকে সর্বাধীকরণ এবং মন্দকে সর্বনিম্ন করার প্রয়াস পায়। এভাবে আয় ও ব্যয়ের তুলনা করে মুনাফা নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে উপযোগ বা উপযোগবাদ নির্ধারিত হয় আয়ব্যয় বিশ্লেষণ ও অর্থের মাপকাঠিতে।

অন্যদিকে, নৈতিক দিক থেকে উপযোগবাদ ও ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয় সেই কাজ দিয়ে, যা অধিক সংখ্যক লোকের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে ৷

৩। সার্বিক যুক্তিবাদ (Universalism) : ইমানুয়েল কান্ট (Immnuel Kant) সার্বিক যুক্তিবাদের একজন অগ্রদূত। তিনি কজন আমদindows বলেন, যিনি কর্তব্যবোধ থেকে দায়িত্ব পালন করেন, তার সে-ই নীতিই মানব জীবনের জন্য সম্পদ হতে পারে । কারণ সার্বিক যুক্তিবাদের মূল কথা হলো নিজের স্বার্থ থেকে শুরু করে পরিবারের সকল সদস্যের, নিজ সম্প্রদায়, সমাজ ও সারা activate দেশের মানুষের কল্যাণের দিকে নজর রেখে কর্তব্য পালন করতে হয়। সুতরাং এ তত্ত্ব মতে- কর্তব্যের সীমা অনেক বিস্তৃত।

এ ক্ষেত্রে নৈতিক বিষয়গুলো সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। সম্পূর্ণরূপে কর্তব্য পালনের মধ্যে সকলের কল্যাণ নিহিত । উদাহরণস্বরূপ: মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া থেকে বিরত থাকা, বলপূর্বক কিছু করা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা পরিপূর্ণ কর্তব্য পালনের মধ্যে পড়ে। কান্ট (Kant) সর্বজনীন আইনের সূত্রের কথা বলেছেন (The formula of Universal Law)।

এতে বলা হয়েছে যে, আমাদেরকে এমন কিছু কাজ করতে হবে যেন অন্যরা তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে; আবার, অন্যদেরও এমন কিছু কাজ করা উচিত যাতে আমরা আমাদের অধিকার ভোগ করতে পারি। এটিই হলো সর্বজনীন আইনের সূত্র। এ ক্ষেত্রে কেউ আমাদেরকে যৌক্তিক হওয়ার জন্য চাপ দেবে না, স্বাভাবিক হতেও বলবে না।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সাধারণত: নৈতিকভাবেই কাজ করে থাকি, যখন জানি যে যৌক্তিকভাবে কাজ করা সময়ের দাবী। কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে যে যুক্তি প্রয়োগ করা হয়, তা বিশ্লেষণ করলেই নৈতিকতার সমাধান পাওয়া যায়। অবলম্বন ভাবা ঠিক নয় বরং প্রতিটি মানুষের মধ্যেই স্বয়ং প্রত্যাশা পূরণের সুন্দর অবস্থা রয়েছে।

৪। ন্যায় বিচার তত্ত্ব (Theory of Justice) : ন্যায়বিচার তত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো: সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে বিচার- বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও সাম্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষ-পাতিত্বের অর্থই হলো- অনৈতিকতা। ন্যায় বিচার তত্ত্বকে বণ্টনমূলক ধারণা হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ এটি সমাজের যাবতীয় সম্পদ সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্বারোপ করে ৷

এ তত্ত্বটির সাথে উপযোগবাদ তত্ত্বের মিল রয়েছে। উপযোগবাদ তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, ব্যক্তিকে সামাজিক কল্যাণের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। আবার ন্যায়বিচার তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে উপায় হিসাবে ধরে যদি সুদূরপ্রসারী কল্যাণ অর্জন করা যায়, তা-ই ন্যায্য হয়ে পড়ে। একটি বণ্টন ব্যবস্থা সঠিক ও উপযোগী বলে গণ্য হবে যদি তা শুধু স্বাধীন ব্যক্তি দ্বারা প্রণীত হয়।

ন্যায়বিচার তত্ত্বের নীতিই বলে দেয় যে, বিভিন্ন শ্রেণির মানষের জন্য নির্ধারিত নিয়মনীতি কি ঠিক হবে। ন্যায়বিচার তত্ত্বটির নীতিগুলো সকলের নিকট সমভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। উপর্যুক্ত বিভিন্ন তত্ত্বের আলোচনা ও পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্যবস্থাপনা ছাত্রদের বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিকতার তত্ত্বসমূহ অধ্যয়নের উদ্দেশ্য একটাই হতে পারে,

আর তা হলো: ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্প সেবা দেওয়া হয়; যেন প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা-কমচারী ও সাধারণ জনগণ উপকৃত হয়; সমাজের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই ব্যবসায় নৈতিকতার বিভিন্ন তত্ত্ব অধ্যয়নের মূল উদ্দেশ্য।

 

ব্যবসায় নৈতিকতার তত্ত্ব ও কৌশল

Leave a Comment