আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১০ এর অন্তর্গত।
কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ
দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা সাপেক্ষে যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, তা-ই স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনা ছয়টি পদক্ষেপ নিয়ে গঠিত হয় যা নিম্নের চিত্রে উপস্থাপন করা হলো:

চিত্ৰ: কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা
নিম্নে চিত্রে প্রদর্শিত প্রতিটি পদক্ষেপের বর্ণনা দেওয়া হলো:
১। উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা: উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রথম কাজ। অর্থাৎ কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে, পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে তা যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কারণ এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রতিষ্ঠানের সমগ্র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বিশ্লেষণ করা হয় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের গুরুত্বানুযায়ী স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার মাধ্যমে অনুকূল প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় ।
২। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: সঠিকভাবে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উৎস হতে তথ্য সংগ্রহ করত: সেগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সঠিক উৎস হতে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা একান্ত আবশ্যক যা পরিকল্পনাকে ফলপ্রসূ করে তুলবে। বিক্রয় সেবা, ব্যয়, মজুত মাল, বাজারের অবস্থা, উৎপাদনের মান, কাঁচামাল সরবরাহের lead- time, কর্মীদের আসা যাওয়া,
নগদ প্রবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সঠিক গতিপ্রবাহ নির্ণয় করা স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই গতিপ্রবাহ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় ।
৩। পরিবেশ মূল্যায়ন: স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক পরিবেশকে মূল্যায়ন করতে হবে। বাহ্যিক পরিবেশের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনশীলতা, সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানকে বাজারে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নিজের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে হবে।
এউপর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে এ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।কোনো প্রতিষ্ঠান সমাজের ঊর্ধ্বে নয়। তাই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে সামাজিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী উপাদান হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা। পরিকল্পনা প্রণয়নে এগুলো অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
8. সম্পদ নিরীক্ষা: সম্পদ নিরীক্ষা বলতে বুঝায় যে, প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কী ধরনের ও কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা। কারণ স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে যে সকল সম্পদের প্রয়োজন তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে, ঐ সকল সম্পদ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিমাণ রয়েছে কি না। কারণ, শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেই চলবে না, তা বাস্তবায়নও দরকার।
তাছাড়া, প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যতীত সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন করাও দুষ্কর। তাই পরিকল্পনার কাজে হাত দেওয়ার পূর্বে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। যে পদ্ধতিতে এ ধারণা অর্জন করা হয়, তাই সম্পদ নিরীক্ষা।
৫। বিকল্প স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠা: স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার অর্থ হচ্ছে পরিকল্পনায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিভিন্নভাবে এ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, যেমন: “ধাপে ধাপে অগ্রসর হও” বা “ছোট থেকে বড়”, “লৌহ উত্তপ্ত হলে আঘাত কর”, “সময় গুরুত্বপূর্ণ উপশমকারী”,
“ঝোক বুঝে কোপ মার”, “একতাই বল”, “দ্রুত ফল দেখাও”, “ধীরে চল”, “বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে শাসন” এবং “ঘোলা পানিতে মাছ শিকার” ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা সাপেক্ষে উক্ত বিকল্প স্ট্র্যাটেজিসমূহ থেকে উপযুক্ত স্ট্র্যাটেজি বাছাই করতে হবে ।
৬ । স্ট্র্যাটেজিক পছন্দ: এটি স্ট্রাটেজিক পরিকল্পনার সর্বশেষ ধাপ। এটি অত্যন্ত জটিল ধাপ। কারণ এ ধাপে প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্ট্রাটেজিটি বাছাই করতে হয়। চারটি উপাদান প্রতিষ্ঠানের স্ট্রাটেজি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে, যেমন:
ক. বাহ্যিক নির্ভরশীল উপাদানের উপর ব্যবস্থাপনার ধারণা; এগুলো হলো: মালিক, প্রতিযোগী, ক্রেতা, সরকার ও সমাজ ইত্যাদি ।
খ. ঝুঁকির প্রতি ব্যবস্থাপনার মনোভাব।
গ. প্রতিষ্ঠানের অতীত স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে সতর্কতা এবং
ঘ. সাংগঠনিক কাঠামোয় ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা ও সম্পর্কের অবস্থান ।
উক্ত বিষয়াবলীর আলোকে ব্যবস্থাপনাকে স্ট্র্যাটেজি নির্বাচন করতে হয়। নির্বাচিত স্ট্র্যাটেজি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। তবে এ বিষয়ে Henry Mintzberg বলেন, “উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাকে এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে স্ট্র্যাটেজি নির্বাচন করতে হয় যে, নির্বাচিত স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।”

পরিশেষে বলা যায় যে, একটি সুষ্ঠু স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনায় উক্ত পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়। এগুলির সঠিক অনুসরণের উপরই স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার সঠিকতা, সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে।
