আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বিশ্ব মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতির পরিমাপ। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১৩ এর অন্তর্গত।
Table of Contents
বিশ্ব মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতির পরিমাপ

সংস্কৃতি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয় যা মানুষ তার পরিবেশে তৈরি করে। জ্ঞান, বিশ্বাস, কলা, নৈতিকতা, আইন, রীতি এবং অন্য যে কোনো সক্ষমতা বা অভ্যাস যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জন করে, তা-ই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি-ই হলো সবকিছু যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে চিন্তা করেছে এবং করে থাকে ।
বিদেশের বাজারে প্রতিষ্ঠান চালু করতে হলে অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। অর্থনৈতিক, বাজার, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা অবশ্যই বিদেশে ব্যবসায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এদের মধ্যে প্রধান ইস্যু হলো স্বাগতিক দেশের সংস্কৃতি এবং কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির নিজ দেশের সংস্কৃতির সাথে তুলনা করা হবে, সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
নিজ দেশের সংস্কৃতির সাথে স্বাগতিক দেশের সংস্কৃতির যে পার্থক্য, তা বিচার করতে না পারলে প্রতিষ্ঠান যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই । বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণের জন্য Hofstede একটি মডেল প্রবর্তন করেন যেখানে চারটি দিকে সংস্কৃতির পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১। প্রথম দিকটি হলো:
একটি সমাজে মানুষ একক সিদ্ধান্ত নেয় নাকি দলগতভাবে বা গণতান্ত্রিক উপায়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তা বিবেচনা করা। একত্ববাদে একক ব্যক্তির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যেখানে দলগত বা গণতান্ত্রিক মতবাদে সমবেত হওয়া, সৌহার্দ্য, পারস্পরিক অনুভূতি এবং অন্যকে শ্রদ্ধা করা ইত্যাদি বিষয় যুক্ত থাকে।
২। দ্বিতীয় দিকটি হলো:
ক্ষমতার পার্থক্য (Power Distance) । এতে দেখা হয় যে, সমাজে ক্ষমতার ধারাটি উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরে নেমে আসছে কিনা, নাকি সদস্যদের মধ্যে অসমহারে এটি বণ্টিত হয়েছে। ক্ষমতার অসম বণ্টনের ফলে সমাজে অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি দেখা দেয়।
৩। তৃতীয় দিকটি হলো:
অনিশ্চয়তাকে এড়িয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, সমাজ কতটুকু অস্পষ্টতায় ও মূল্যবোধে আরামবোধ করবে তা এতে বলা হয় এবং এটি ঝুঁকি গ্রহণে সাহস যোগায়।
৪। চতুর্থ দিকটি হলো:
সমাজকে দুটিভাগে ভাগ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমাজ কতটুকু ‘পুরুষত্ব’ (Manculine) বা ‘নারীত্ব’ (Femininity) প্রকাশ করবে। পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেকে খুব অগ্রগামী, সুনির্দিষ্ট এবং সফলতার দিকে আলোকপাত করে। অন্যদিকে, নারী প্রধান সমাজে পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে জোর দেয় এবং একে অপরের কল্যাণের দিক নজর দেওয়া। এ দুটি লিঙ্গ দিয়ে মূলত সমাজের সংস্কৃতিক আচরণকে তুলে ধরা হয়েছে।
‘পুরুষ’ সমাজ বলতে জীবনের সাংখ্যিক পরিমাণ এবং ‘নারী’ দ্বারা জীবনের গুণগত দিক-কে বুঝানো হয়েছে ।
বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে আর একটি মডেল উন্নয়ন করেছেন Hall নামে একজন গবেষক। তিনি এটিকে ৫টি নিরব ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেমন:
(i) সময় (Time) ;
(ii) জায়গা (Space) ;
(iii) বস্তুগত পণ্য (Material Goods) ;
(vi) বন্ধুত্ব (Friendship) ;
(v) চুক্তি (Agreement) ।
(i) সময় (Time) :
সময় বলতে বোঝানো হয়েছে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা সময়কে কীভাবে ব্যবহার করি এবং আমাদের নিত্য জীবন ব্যবস্থাপনায় সময়কে কীভাবে ব্যবহার করি ।
(ii) জায়গা (Space) :
এর অর্থ হলো যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু জায়গা ব্যবহার করি এবং দূরত্ব বজায় রাখি । উদাহরণস্বরূপ- কথাবার্তার সময় দুই ব্যক্তির মধ্যে কতটুকু দূরত্ব থাকে? বন্ধুত্ব, আনুষ্ঠানিকতা ও ঘনিষ্ঠতা প্রভৃতিও একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বিনিময় করা হয়। বিভিন্ন পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদাকে বোঝাবার জন্য অফিসে কীভাবে জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে? একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যক্তিগত কক্ষ রয়েছে কি না বা গাড়ির জন্য আলাদা পার্কিং আছে কি না?
(iii) বস্তুগত পণ্য (Material Goods) :
বস্তুগত পণ্যকেও একইভাবে ক্ষমতা, সফলতা ও মর্যাদাকে নির্দেশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। কিছু সংস্কৃতিতে এগুলো কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদাকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। কোম্পানির গাড়ি, কিংবা উচ্চ বেতন যা নিচের স্তরের কর্মীদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি, এগুলো কোম্পানির নিরব ভাষা হিসেবে কাজ করে ।
(vi) বন্ধুত্ব (Friendship) :
বন্ধুত্ব দ্বারা প্রকাশ পায় যে, কীভাবে কোম্পানিতে আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে ও ধরে রাখি। উদাহরণস্বরূপ: বন্ধুত্ব কী দ্রুত গড়ে উঠে আবার ভেঙ্গে যায়? তারা কী দীর্ঘ সময়ে ফাউন্ডেশন গড়ে তুলে? তাদের কী পারস্পরিক বন্ধুত্বে আপত্তি আছে? অথবা উভয়পক্ষ যতদিন সুবিধা আছে, ততদিন বন্ধুত্ব ধরে রাখে? কোন কোন সংস্কৃতিতে বস্তুগত পণ্যের মাধ্যমে মর্যাদা পায়, আবার অন্য সমাজে মর্যাদা বোধ করে বন্ধুত্ব বিনিময়ের মাধ্যমে। সুতরাংind দেখা যায় যে, এক এক সমাজের সংস্কৃতি এক এক রকমের ।
(v) চুক্তি (Agreement) :
এটি দ্বারা বোঝায় যে, কীভাবে একটি জনমত মানুষের কাছে পৌছায়। উদাহরণস্বরূপ ব্যবসায়িক চুক্তি লিখিত বা মৌখিক হবে কি না, নাকি দুপক্ষের হাত মেলানোর (handshake) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
মূল কথা হলো বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্যের প্রতি নজর দিলে প্রতিষ্ঠানে সফলতা আসে এবং ব্যবসায় ও মানব সম্পদ কৌশল উন্নয়নে সফল হওয়া যায়। কারণ স্বাগতিক দেশের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই ব্যবসায় কৌশল ও মানব সম্পদ কৌশল নির্ধারণ করতে হয়। এটি বলা খুব মুশকিল যে, সংস্কৃতিগত পার্থক্য কীভাবে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে প্রভাব ফেলে ।
যেহেতু সমাজের সংস্কৃতি আছে, প্রতিষ্ঠানেরও সংস্কৃতি আছে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরকে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিকে মুখোমুখি করতে হবে এবং পরীক্ষা করতে হবে যে, প্রতিষ্ঠান সেখানে টিকে থাকার জন্য ফিট কি না । একইসাথে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবসায় কৌশল ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশল উন্নয়ন করতে পারবে কিনা- তা বিবেচনা করতে হবে।
বিদেশে ব্যবসায় করতে যাওয়ার পূর্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের চিন্তা করা প্রয়োজন যে, তারা স্বাগতিক দেশে মানব সম্পদ পলিসি বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা। আবার, সেখানে নৈতিকতার কিছু বিষয়ও রয়েছে। নৈতিক সিদ্ধান্তের উপর কোম্পানির শক্তি প্রকাশ পায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরকে বুঝতে হবে যে, কোম্পানি কী কী মূল্যবোধ গভীরভাবে অনুসরণ করে যা পরিবর্তন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এতে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুযোগ হাতছাড়া হলেও কোম্পানির মূল্যবোধ পরিবর্তন করা যাবে না। এতে প্রতিষ্ঠানের মিশন, কৌশল ও মানব সম্পদ চর্চা আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে।
