বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১৩ এর অন্তর্গত।

বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ

একটি কোম্পানি বিভিন্ন উপায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে এবং বিদেশে এর কর্মীদেরকে কাজে পাঠাতে পারে। সেগুলো হলো: পণ্য রপ্তানি, উপচুক্তি বা লাইসেন্স, যৌথ কোম্পানি, সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান স্থাপন ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি মাধ্যম ব্যবহার করতে পারে, যেমন:

(i) প্রশাসনিক এ্যাপ্রোচ:

বিদেশে যাওয়ার জন্য কাগজে-কলমে সাহায্য করা। যেমন: টিকিট করে দেওয়া, কর্মীর জন্য ভিসা ও পরিবারের জন্য ভ্রমণ ভিসা জোগাড় করে দেওয়া, ট্যাক্স পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

(ii) ট্যাকটিক্যাল এপ্রোচ:

এর মাধ্যমে বিদেশে গমনরত কর্মীদেরকে সংক্ষিপ্ত (এক দিনের) প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেন তারা কার্যক্ষেত্রে অকৃতকার্য বা ব্যর্থ না হয়।

(iii) কৌশলগত এ্যাপ্রোচ:

এতে বিদেশে গমনরত কর্মীদেরকে বেশি করে সমর্থন সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।

উপর্যুক্ত পদ্ধতি ছাড়াও বিদেশের কাজে কর্মীদেরকে পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও কিছু কাজ করতে হবে। যেমন: কৰ্মী নির্বাচন সিস্টেম মানতে হবে, চলমান ও সমন্বিত প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা সিস্টেম, গন্তব্যে সেবা প্রদান ও সর্বোপরি কৌশলগত বিদেশ গমন কর্মসূচি অনুসরণ ।

যাই হোক, বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ একটি মডেলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। মডেলটি নিচে দেওয়া হলো:

 

বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ

চিত্র : বিশ্ব কার্যক্ষেত্রে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ।

মডেলের বর্ণনা :

মডেলে দেখা যাচ্ছে যে, কোনো কোম্পানি তিন ধরনের সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করে বিদেশে কোম্পানি স্থাপনের বা বিদেশি বাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেমন: স্থানীয় সংস্কৃতি, জাতীয় সংস্কৃতি ও নিজ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সংস্কৃতি। ব্যবসায়িক সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে- মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। এউপর কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুগুলো পর্যালোচনা করা হয়। এক্ষেত্রে বিষয়গুলো নিম্নরূপ :

১। বিদেশ গমনের উদ্দেশ্য (Purpose of Expatriation) :

প্রথমেই কার্যক্ষেত্রের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়। কার্যক্ষেত্রের বহুবিধ কারণ থাকে, যেমন: ব্যবসায় বা বাজার উন্নয়ন, কর্মী সংস্থাপন, বদলি, কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, নিজ দেশের কার্যের সাথে বিদেশের কার্যের সমন্বয়সাধন; স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় মেধা উন্নয়ন প্রভৃতি ।

২। কর্মী নির্বাচন (Selection) :

কার্য নির্ধারণের পর কর্মী নির্বাচনের প্রশ্ন আসে। কারণ নির্ধারিত কার্যসম্পাদনের জন্য যোগ্য কর্মীর প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান ও কর্মীর উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় করে বিদেশে পাঠানোর জন্য কর্মী নির্বাচন করতে হবে। উচ্চ পর্যায় ব্যবস্থাপনার জন্য, কারিগরি দিক উন্নত করার জন্য কর্মীদেরকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

৩। পরিচিতিকরণ (Orientation) :

উপযুক্ত কর্মী নির্বাচনের পর তাদেরকে কার্যপরিবেশ ও কার্য সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে যাতে তারা নিজেদেরকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। কর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও খাপ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হওয়ার কারণ হলো: তারা এবং তাদের পরিবার স্বাগতিক দেশের সংস্কৃতির সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারে না। তাই কর্মী ও তাদের পরিবারকে ভালোভাবে চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা নিজেরা খাপ খেয়ে চলতে পারে।

অন্যদিকে, নিজ দেশে প্রধান কার্যালয়ের কর্মীদেরকেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা বিদেশে কর্মরতদের সাথে ভালো ও যৌক্তিক আচরণ করেন। দেখা যায় যে, স্থানীয় সংস্কৃতি (বিদেশে) ও নিজ দেশে প্রধান কার্যালয়ের সংস্কৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এ জন্য প্রধান কার্যালয়ের কর্মীদেরকে সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ (Sensitivity Training) দেওয়া প্রয়োজন । এ প্রশিক্ষণের ফলে তারা বুঝতে পারবে যে,

(i) কেন স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে;

(ii) প্রবাসীদেরকে সমর্থন দেবে এবং তাদেরকে বুঝতে সক্ষম হবে নিজ দেশের কাঠামো মোতাবেক। এর বাইরে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয় প্রবাসে বাড়িভাড়া, আসবাবপত্র বাবদ, বাসায় অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, গাড়ির ড্রাইভার ও অন্যান্য সুবিধাসমূহ ।

৪। বিদেশ গমনকারীদের বা প্রবাসীদের পরিচালনা (Managing Expatriates) :

নিজ দেশ থেকে বিদেশে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর তাদেরকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হবে। তাদের জন্য কার্যসম্পাদন হবে অধিক চ্যালেঞ্জিং। কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে পারে স্থানীয়। তাছাড়া অন্যান্য সহকর্মীগণও হতে পারে স্থানীয়। ফলে তাদের সাথে সবসময় একটা পার্থক্য বিরাজ করবে। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দৈনন্দিন জীবনধারা প্রবাসীদের কাজে প্রভাব ফেলে ।

এরপর বেতনের প্রসঙ্গে আসা যাক। বিদেশে অবস্থান করা নিঃসন্দেহে ব্যয়বহুল। তাই একজন প্রবাসীর বেতন নিজ দেশের তুলনায় কমপক্ষে তিনগুণ বেশি হওয়া প্রয়োজন। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ছেলে-মেয়ের স্কুল, দৈনন্দিন ব্যয় প্রভৃতি কারণে তার খরচের পরিধিও ব্যাপক। অতিরিক্ত ট্যাক্স পরিশোধের ব্যাপারও থাকবে। সুতরাং প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক। এর উপর প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ও বিদেশে প্রবাসীর পরিবার এর অবস্থান সক্ষমতা নির্ভর করে।

প্রবাসীর বেতন নির্ধারণে তিনটি এ্যাপ্রোচ ব্যবহার করা হয় :

প্রথমত: উদ্বৃত্তপত্র পদ্ধতি (Balance Sheet Method) ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে বেতন পরিশোধ করা হয়। নিজ দেশের কাঠামো মোতাবেক। এর বাইরে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়- প্রবাসে বাড়িভাড়া, আসবাবপত্র বাবদ, বাসায় অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, গাড়ি ও ড্রাইভার ও অন্যান্য সুবিধাসমূহ দেওয়া হয় স্বাগতিক দেশের পরিশোধের উপর ভিত্তি করে ।

দ্বিতীয়টি হলো: The Higher of Home or Host Approach: এতে বলা হয়েছে যে, প্রবাসীকর্মী নিজ দেশে যে বেতন পায় তা বিবেচনায় নিয়ে স্বাগতিক দেশে (বিদেশে) জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ হওয়াতে উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হয় । স্বাগতিক দেশে একজন নির্বাহীর মান (Standard) কী হওয়া উচিত সে অনুযায়ী এ এপ্রোচে বেতন নির্ধারণ করা হয়।

তৃতীয়টি হলো: স্থানীয়করণ এ্যাপ্রোচ (Localization Approach) : এ এ্যাপ্রোচটি সাধারণত: স্থায়ী প্রবাসী কর্মীদের জন্য প্রয়োগ করা হয়। এতে বলা হয়েছে যে, প্রবাসীর নিজ দেশের উত্তোলিত বেতন স্বাগতিক দেশের বেতন কাঠামোতে রূপান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট দেশের বেতন কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয় ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে প্রথমে বেতন কম মনে হতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে সমন্বয় করা হয়ে যায়। এ পদ্ধতিটিই বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে ।

৫। মান নির্ধারণের স্তর (Level of Standardization) :

হিনান ও পার্লমুটার চারটি এ্যাপ্রোচের কথা বলেছেন যা একটি প্রতিষ্ঠান পলিসি নির্ধারণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে গ্রহণ করতে পারে, সেগুলো হলো:

(i) এক সংস্কৃতির সাথে অন্য সংস্কৃতির তুলনা (Ethnocentric);

(ii) বহুমাত্রিক সংস্কৃতি (Polycentric) ;

(iii) আঞ্চলিক সংস্কৃতি (Regiocentric); এবং

(iv) ভৌগলিক সংস্কৃতি (Geocentric)।

(i) এক সংস্কৃতির সাথে অন্য সংস্কৃতির তুলনা (Ethnocentric) :

এ এ্যাপ্রোচ অনুসারে কোম্পানির নিজস্ব সংস্কৃতি ও চর্চাসমূহ বা পদ্ধতিসমূহ বিদেশে প্রয়োগ করা। কোম্পানির প্রতিযোগীতামূলক কৌশল হলো বিদেশে নিজস্ব সম্মান ও সুনামWindd গড়ে তোলা। এটি মান অর্জন, সমন্বয়সাধন ও দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক হবে। তবে এটি যদি অন্য সংস্কৃতির উপর জোর করে প্রয়োগ করতে চায় তা হলে সুবিধা তো হবে না বরং এতে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।

(ii) বহুমাত্রিক সংস্কৃতি (Polycentric) :

এ এ্যাপ্রোচ অনুযায়ী কোম্পানি বিদেশে স্থাপিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও শ্রম বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে নিজস্ব পলিসি প্রয়োগ করে। বর্তমান বাজারের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ ও স্থানীয়করণ করা হয়। এতে বাজারে ক্রেতাদের রুচির সাথে খাপ খাইয়ে কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ পদ্ধতিটি বেশ সাড়া প্রদানকারী। এতে শ্রম ঘূর্ণন কম হয় ।

(iii) আঞ্চলিক সংস্কৃতি (Regiocentric) :

ভৌগলিক আঞ্চলিকতার উপর ভিত্তি করে এ পদ্ধতি কাজ করে এবং ব্যবস্থাপনা পলিসি নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা হয়। ফলে কার্যের মধ্যে মিল ও দক্ষতা বিরাজ করে। তবে অঞ্চলসমূহের মধ্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। এটি স্থানীয় বাজারকে সমর্থন করে।

(iv) ভৌগলিক সংস্কৃতি (Geocentric) :

এ এ্যাপ্রোচের এক সেট বিশ্বমানের পলিসি ও প্রয়োগ পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয় এবং বিশ্বের সবস্থানে বা প্রতিষ্ঠানে তা প্রয়োগ করা হয়। এ এ্যাপ্রোচটি প্রথম এ্যাপ্রোচ (Ethnocentric) থেকে পৃথক হয়ে থাকে। তা হলো: ভৌগলিক সংস্কৃতিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যে বিশ্বের শ্রম শক্তিকে বিবেচনা করে, সেই সাথে সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই পলিসি উন্নয়ন ও প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালায়। তবে এটি বাস্তবায়ন করা একটু কঠিন। কারণ, বিভিন্ন দেশের সরকারের বিভিন্ন পলিসি, আইনকানুন বিবেচনায় নিতে হয়।

নিচে চারটি সংস্কৃতির একটি তুলনামুলক তালিকা উপস্থাপন করা হলো :

 

বিশ্ব কার্যক্রমে কৌশলগত মানব সম্পদ ইস্যুসমূহ

তালিকা : আন্তর্জাতিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চার সংস্কৃতিগত পদ্ধতি

Leave a Comment