আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের প্রকৃতি। যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১৩ এর অন্তর্গত।
Table of Contents
বাংলাদেশে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের প্রকৃতি

বাংলাদেশে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের প্রকৃতি নিচে আলোচনা করা হলো :
১। কমবেশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা (More or Less Efficient Management) :
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। মাত্র কয়েক বছর ধরে দেশে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। দেশের সব প্রতিষ্ঠানেই এটি এখনও ব্যাপকহারে প্রয়োগ করা হয়নি। মাত্র কিছু প্রতিষ্ঠানেই এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে তারা সফলভাবে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। তাই বলা যায় যে, বাংলাদেশে কমবেশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা বিদ্যমান।
২। কম-বেশি অঙ্গীকারাবদ্ধ কর্মীগণ (More or Less Committed Employees) :
বাংলাদেশে কর্মীরা তাদের প্রতিষ্ঠান বা মালিকের প্রতি কমবেশি অঙ্গীকারাবদ্ধ। তারা প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা প্রয়োগ করে থাকে। তারা মনে করে যে, তাদের সফলতা মানেই প্রতিষ্ঠানের সফলতা। সুতরাং দেখা যায় যে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মীগণই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
৩। কমবেশি দক্ষ কর্মীগণ (More or Less Skilled Employees) :
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ও ছোট দেশ । কিন্তু আয়তনের তুলনায় লোক সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ও গুণগত মান উল্লেখযোগ্য নয়। তাই বাংলাদেশে প্রচুর অদক্ষ ও আধাদক্ষ লোক রয়েছে। কিন্তু যারা দক্ষ, তারা তাদের কাজ খুব দক্ষতার এর কাজ খুব দক্ষতারdov সাথে ও ফলপ্রসূভাবে সম্পন্ন করতে পারছে।
8। সরকারি চাপ বেশি (More Pressure form Government ) :
বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি সবখানেই সরকারের হস্তক্ষেপ রয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানেই সরকারের চাপ বেশি। আবার, কিছু প্রতিষ্ঠানে সি,বি,এ (CBA) অর্থাৎ দরকষাকষি প্রতিনিধি রয়েছে যারা তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও সরকারকে চাপ দিয়ে থাকে। এ দিক থেকে প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা পলিসি বাস্তবায়নে একটু সমস্যা রয়েছে।
৫৷ সরকার থেকে সিদ্ধান্ত আসে (Decisions Come from the Government) :
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো: অধিকাংশ সিদ্ধান্ত সরকার থেকে আসে যা প্রয়োগ করতে গেলে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা পলিসি বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দেয়। এতে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৬। উচ্চ মাত্রায় অনিয়ম চর্চা (High Degree of Irregularities) :
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কখনোই নিয়মিতভাবে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ বা চর্চা করে না। কর্মকর্তাগণ এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন ও অনিয়মিত। ফলে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা পলিসি প্রয়োগের সুফল থেকে প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়।
৭। জবাবদিহি জ্ঞানের অভাব (Lack of Sense of Accountability) :
প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য জবাবদিহিতার জ্ঞান থাকা জরুরি। কারণ, জবাবদিহিতাই ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদেরকে সঠিক পথে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। এতে ব্যবস্থাপনা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহিতার অভাবে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োগে সমস্যা দেখা দেয় ।
৮। সরকারি প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ পলিসির অভাব (Lack of Human Resource Policy in Public Enterprises) :
বাংলাদেশে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন পলিসি রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকে হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানব সম্পদ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট পলিসি নেই। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিতাকারে মানব সম্পদ পলিসি অনুসরণ করা হয়। এতে তারা সফলও হচ্ছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট করে কোনো কর্মী সংগ্রহ, নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, বেতন, মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয় না ।
৯। শ্রমিক সংঘের চাপ (Pressure of Trade Union) :
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকসংঘ রয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। অর্থাৎ, তাদের অনৈতিক চাপে পড়ে কোনো সঠিক নীতি গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রয়োগ করতে পারে না প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এতে প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত মানৰ dow ব্যবস্থাপনা চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় ।
১০। রাজনৈতিক চাপ (Political Presure) :
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন বিষয়ে অযাচিত বা অবৈধ রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তো এটি ঘটেই। ফলে এ সকল প্রতিষ্ঠান কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োগে বাধাগ্রস্ত হয় ।
১১। দ্রুত সিদ্ধান্তের অভাব (Lack of Quick Decesion) :
প্রতিষ্ঠানের অনেক বিষয়েই দ্রুত সিদ্ধান্তের দরকার হয়। বিশেষ করে সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কিন্তু সেখানে মানব সম্পদ পলিসি এ রকম যে, প্রয়োজন হলেও ব্যবস্থাপকগণ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। যদিও কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপকদেরকে এ সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা যথারীতি অনুসরণ করা হয় না ।
১২। সব ধরনের সম্পদের অনুপযুক্ত ব্যবহার (Improper Utilization of All Resources) :
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের অনুপযুক্ত ব্যবহার। অবহেলায় হোক আর যে কোনো কারণেই হোক প্রতিষ্ঠানের সকল ধরনের সম্পদকে যথোপযুক্ত ব্যবহার করা হয় না। কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
১৩। উপযুক্ত পরিবেশের অভাব (Lack of Proper Environment) :
প্রতিটি কাজের প্রতিটি দিকে পরিবেশ গুরুত্ব পূর্ণ activa ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের চারদিকের পরিবেশ অনুকূল ও প্রতিকূল উভয়ভাবেই কাজের উপর প্রভাব ফেলে । একইভাবে, কার্যক্ষেত্রে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পরিবেশ প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং দেখা যায় যে, বাংলাদেশে কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের পরিবেশের অভাব রয়েছে।
১৪। শ্রমিক-ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব (Lack of Proper Labour-Management Relations):
সাধারণভাবে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিক-ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভালো সম্পর্কের অভাব রয়েছে। আর তাই মাঝে মধ্যেই প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক অসন্তোষের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এতে উৎপাদনসহ সকল কার্যক্রম সম্পাদনে বিঘ্ন ঘটে। ব্যবস্থাপনা মনে করে শ্রমিকগণ তাদের বিপক্ষে, অন্যদিকে শ্রমিকগণ মনে করে ব্যবস্থাপনা আমাদের ভালো চায় না।
এহেন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনার কাজই সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। অর্থাৎ, এ সমস্যা কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করে থাকে ।
১৫। কৌশলগত কর্পোরেট সংস্কৃতির অভাব (Lack of Corporate Strategic Culture) :
কৌশলগত-কর্পোরেট সংস্কৃতি বলতে বুঝায় এমন অবস্থাকে যেখানে মানব সম্পদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস, মতামত ও আচরণকে বিবেচনা করা হয় । কর্মীদের নিকট থেকে অনুকূল আচরণ পেতে হলে তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে। এভাবে কর্পোরেট সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই কর্মীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করবে।
১৬। কর্মীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বিদ্যমান (Existence of Informal Relations Among the Employees) :
বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই কর্মীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এ সম্পর্কের কারণে অনেক কঠিন কাজ সহজে সম্পাদন করা সম্ভব হয়। পদোন্নতি, বদলি, সুযোগ-সুবিধা আদায়, বেতন ও মজুরি প্রভৃতির ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক জরুরি। এতে কর্মীদের মধ্যেও সুসম্পর্ক গড়ে উঠে ও বজায় থাকে ।

