মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ [ Historical Evolution of Human Resource Management ] – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা” বিষয়ে একটি পাঠ।
Table of Contents
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ
[ Historical Evolution of Human Resource Management ]

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা একদিনে বিকশিত হয়নি। মানুষের সৃষ্টিলগ্ন থেকে ধাপে ধাপে এর বিকাশ ঘটেছে। এক সময় মানুষকে পণ্য ও দাস হিসেবে গণ্য করা হতো। বর্তমানে পণ্য যেমন বেচা-কেনা হয়, তখন মানুষও বেচা-কেনা হতো । কৃতদাসদের নিজস্ব কোনো চাওয়া-পাওয়া বা চিন্তা-চেতনা ছিল না। তারা মনিবের ইচ্ছার সব কিছু করতে বাধ্য ছিল। ইতিহাসের স্রোতধারায় স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ক্ষেত্রবিশেষে অবস্থার কিছুটা হেরফের হলেও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কৃতদাস প্রথা দীর্ঘ দিন চলতে থাকে।
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ:
পরবর্তীকালে বৃহদায়তন উৎপাদন, পুঁজিবাদের উত্থান, সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা চালু, ব্যবস্থাপনা চিন্তা-চেতনার উদ্ভব, শিল্প বিপ্লব, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিকাশ এবং রাষ্ট্রক্ষমতায়, সকলের অংশগ্রহণ ইত্যাদি ধারণাগুলো জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। এর সাথে তাল মিলিয়ে শিল্প-কারখানায় কর্মরত কর্মীদের সম্পর্কে ধ্যান-ধারণাতেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের সম্পর্কে পরিবর্তিত ধারণাগুলোর আলোকে নিম্নে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ আলোচনা করা হলো:
১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ:
প্রাগৈতিহাসিক যুগ হলো সেই যুগ যে যুগ সম্পর্কে বর্তমান মানুষের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। অনেকটা অনুমান হতে ঐ সময় সম্পর্কে মানুষ মোটামুটি ধারণা গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যখন পাহাড়ের গুহায় অথবা বন-জঙ্গলে বাস করতো তখন থেকেই তারা দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অবশ্য মানুষ তখন কোনো কিছুই উৎপাদন করতো না। তখন তারা কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় ফল-মূল সংগ্রহ করে জীবনধারণ করতো। পরবর্তীকালে তারা মানুষের অথবা গোত্রের সংগৃহীত উদ্বৃত্ত পণ্য অন্যদের সাথে বিনিয়ম করতে শেখে। কালক্রমে মানুষ যখন উৎপাদন করতে শেখে তখন নিজেরাই শ্রম দিয়ে তা উৎপাদন করতো এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদিত পণ্য অন্যদের সাথে বিনিময় করে তাদের নানাবিধ চাহিদা মেটাতো। তখন মানব সম্পদ সম্পর্কে কোনো ধারণায় তাদের মধ্যে ছিল না।
আজ থেকে প্রায় ৭ হাজার বছর পূর্বে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার বছর পূর্বে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্য মিশরের পিরামিড তৈরি করা হয়। পিরামিডই প্রাচীন মিশরে ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক প্রকৃষ্টতার এক মৌন সাক্ষ্য বহন করে। টিউন্স-এর বিখ্যাত পিরামিড ১৩ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে রয়েছে ২৩,০০,০০০ ব্লক পাথর এবং প্রতিটি ব্লক পাথরের ওজন গড়ে আড়াই টন।

এ পিরামিড তৈরি করতে ১ লক্ষ লোক ২০ বছর ধরে পরিশ্রম করেছে। মিশরীয় সভ্যতার এ নিদর্শনটি ব্যবস্থাপনার ব্যাপক কর্মযজ্ঞকেই নির্দেশ করে। হয়তো তখন লোকদেরকে দেবতার ভয় দেখিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হতো । তখন এ সকল শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে দেখাতো দূরের কথা তাদেরকে কৃতদাস হিসেবে গণ্য করা হতো । সে সময়ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সে সময়ের অন্যান্য ইতিহাসের ন্যায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানা যায়নি।
২. শিল্প বিপ্লব পূর্ববর্তী যুগ:
অষ্টাদশ শতাব্দীতে অর্থাৎ ১৭৫০ সালের দিকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পূর্বে উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল পরিবারকেন্দ্রিক। তখন পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে স্বল্প পরিসরে উৎপাদন কার্য চালিয়ে যেত। ক্ষুদ্র পরিসরে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা হতো তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হতো। মধ্যযুগের শেষ দিকে (একাদশ খ্রিষ্টাব্দের পরে) ইতালিসহ ভুমধ্যসাগরের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে ব্যবসায় বিস্তার লাভ করলেও কায়িক শ্রম ও পশুশক্তি নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা খুব বেশিদূর এগুতে পারেনি। সে সময় কর্মীদের কৃতদাস হিসেবে না দেখলেও উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে দেখা হতো। তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক দিককে অস্বীকার করা হতো। এ সময়ে ব্যবস্থাপনাসহ জ্ঞানের অন্যান্য শাখার তেমন অস্তিত্বই ছিল না।

৩. শিল্প বিপ্লব পরবর্তী যুগ (১৭৫০-১৮৫০):
জেমস্ ওয়াটের স্টিমইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই মূলত ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে অর্থাৎ ১৭৫০ সালের পর হতে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা শিল্প-কারখানায় রূপ নেয়। এর ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন হতে বৃহদায়তন উৎপাদনে রূপান্তরিত হয়। কারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে নতুন নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। শ্রমিকদের পরিচালনা করার জন্য প্রশিক্ষিত সুপারভাইজারের প্রয়োজন হতে থাকে। মূলত এ সময় হতেই কর্মী ব্যবস্থাপনা ধারণাটির সূত্রপাত হয়। শিল্প বিপ্লবের সময় থেকেই কারখানায় কর্মীদের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

শ্রমিকদের গুরুত্বের কথা চিন্তা করেই ১৮১৩ সালে বৃটিশ শিল্পপতি (বহু উৎপাদনকারী ) Robert Owen (রবার্ট ওয়েন) কর্মীদের মানবিক কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, মিতাচার এবং উন্নত কর্ম পরিবেশের উপর প্রশিক্ষণ চালু করেন। এছাড়াও তিনি কর্মীদের গুরুত্বারোপ করে জন্য তার বস্ত্র কারখানার পাশে একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলেন। কর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এ গ্রামের মধ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কতকগুলো স্বাস্থ্য প্রকল্প গড়ে তোলেন। শ্রমিক ও তাদের সন্তানরা যাতে লেখাপড়া করতে পারে সেজন্য তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কারখানায় শিশু শ্রমিক নিয়োগের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
ঐ সালেই অর্থাৎ ১৮১৩ সালে তিনি “A New View of Society” নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে তিনি শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেন, যা কর্মী উন্নয়নের দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেন। এ কারণেই Robert Owen (রবার্ট ওয়েন) কে কর্মী ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। বিশ্ব শতাব্দীর শুরুর দিকে এমন নিয়োগকারীর সংখ্যা খুবই কম ছিল যারা শ্রমিকদের কল্যাণের কথা চিন্তা ভাবনা করতো। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শিল্প-কারখানায় পৃথক কোনো কর্মী বিভাগ ছিল না। শ্রম সম্পর্ক কেমন হবে এ বিষয়টি মালিকের এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মনায়কের (Foreman) ইচ্ছার উপর নির্ভর করতো।
৪. ১৮৫০ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত (কল্যাণমূলক ব্যবস্থাপনা):
১৮১৩ সালে রবার্ট ওয়েন (Robert Owen) শ্রমিকদের জন্য যে কল্যাণের কথা বলেছিলেন তা Frederick Winslow Taylor (ফ্রেডারিক উইন্সলো টেলর) তা আরো বেগবান করেছেন। ১৯১১ সালে টেলর তাঁর “The Principles of Scientific Management” গ্রন্থের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ধারণা প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে তিনি প্রতিষ্ঠানে কর্মী নির্বাচন, কর্মী প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের যোগ্যতাভিত্তিক মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। তাছাড়া কর্মীদের কার্য পরিমাপসহ বিভিন্ন বিষয় তিনি উল্লেখ করেন। রবার্ট ওয়েন যে ধারা সৃষ্টি করেছিলেন টেইলর সে ধারাকে আরো বিজ্ঞানসম্মত এবং সার্বজনীন করার প্রস্তাব দেন। যদিও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেলর পৃথক কর্মীবিভাগের কোনো উল্লেখ করেননি তবুও পরিকল্পনা বিভাগের আওতায় কর্মীদের বিষয় দেখার জন্য “Employment Bureau” নামে একটি পৃথক উপবিভাগ তৈরি করেন যা পরবর্তী কর্মী ব্যবস্থাপনার সাংগঠনিক রূপায়নে সহায়তা করে।
এরই মধ্যে গরীব ও হতভাগ্য শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য Welfare work” নামে একটি আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা মূলত আমেরিকার শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্নমুখী কর্মসূচি প্রণয়ন করেন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম হতেই শিল্পপতিরা তাদের কারখানায় “Social or Welfare Secretaries- নিয়োগ। দেন এবং এ সকল সচিবকে শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ সকল সচিবরা কর্মী ব্যবস্থাপক নামে পরিচিতি পান। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা ১৯১২ সালে প্রথম “কর্মী বিভাগ” স্থাপন করা হয়। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের কার্য সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্য ১৯২০ সালের দিকে “কর্মী ব্যবস্থাপনা” আত্মপ্রকাশ করে বলেও অনেকে মত প্রকাশ করেন।
কর্মী ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি লাভ করে ১৯০৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে। এসময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শিল্প কারখানার উপর বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করা হয়। এ গবেষণার ফলে কর্মী ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যে “Industrial welfare society” স্থাপন করা হয়। এ সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিল্প ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এসময়ে Fatigue Research Board নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল কারখানা শ্রমিকদের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার দিকগুলো পর্যালোচনা করা। পরবর্তী কালে এ সংগঠনটি “Industrial Health Research Board” নামে পরিচিতি লাভ করে। কর্মী ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা এ সময়ে আন্দোলনে রূপ নেয়।
৫. ১৯২০ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত:
১৯২১ সনে “National Institute of Industrial Psychology স্থাপিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান কর্মী নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায়োগিক গবেষণা আরম্ভ করে। এ সকল গবেষণার ফলে কর্মী ব্যবস্থাপনার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। এরপর ১৯২৪ সালে “Institute of Industrial workers” প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯৩১ সালে “Institute of Labour Management” নামে নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে এটি পুনরায় “Institute of Personnel Management” নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্প প্রতিষ্ঠানের আয়তন বৃদ্ধি পেলে কর্মীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে সময়ে সোভিয়েট ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে শ্রমিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তখন ব্যবস্থাপকগণ কর্মীদের সমস্যা মেটাতে অসুবিধায় পড়েন। এ অবস্থা হতে উত্তরণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পৃথক কর্মী বিভাগ চালু করে।

১৯২৭ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে ওয়েস্টার্ন ইলেকট্রিক কোম্পানিতে কর্ম পরিবেশের উপর গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে Elton Mayo (এলটন মেও) এবং তার সহযোগীরা দেখতে পান যে, প্রাকৃতিক পরিবেশের চেয়ে সামাজিক ও মানবিক উপাদানগুলো উৎপাদনের উপর অধিক প্রভাব ফেলে। তখন থেকেই মানব সম্পর্ক আন্দোলনের সূত্রপাত ।।
৬. ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত (কর্মী ব্যবস্থাপনা ধারণার সৃষ্টি):
এ সময় এলটন মেয়ো হ’খন গবেষণার মধ্য দিয়ে মানব সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার জনক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং তিনি ছিলেন আচরণবাদী চিন্তাগোষ্ঠীর একজন সেরা প্রবক্তা। তিনি হার্ভার্ডে শিল্প গবেষণায় কর্মরত ছিলেন এবং একটা দল নিয়ে ওয়েস্টার্ন ইলেকট্রিক হ’থন কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া জানার গবেষণা পরিচালনা করেন। এ গবেষণা থেকে মেয়ো বলেন, শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং গোষ্ঠী প্রচেষ্টার সমাজতাত্ত্বিক মতবাদের উপর তিনি এই ধারণা গড়ে তুলেন। এ গবেষণার মাধ্যমে তিনি বর্তমান ব্যবস্থাপনা মতবাদের সাথে একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। এ পর্যায়ে তিনি বলেন, একজন ব্যবস্থাপককে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে ব্যক্তি হিসেবে শ্রমিককে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তার চাহিদা, উদ্দেশ্য, উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য অবশ্যই বুঝতে হবে এবং তা পূরণ করতে হবে।
এ সময় মানব-সম্পর্ক একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ কর্মী ব্যবস্থাপনা’ প্রতিষ্ঠিত করে। তাছাড়া কর্মী ব্যবস্থাপনার উপর বিভিন্ন সমিতি ও গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। মূলতঃ এ সময়ই কর্মী, ব্যবস্থাপনা ধারণার প্রসার লাভ করে। এ ধারণায় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের উপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়।
৭. ১৯৫০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত (মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ধারণার সৃষ্টি):
১৯৫০ সালের পর হতে কর্মী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন ধারণার জন্ম লাভ করতে থাকে। এ ধারণায় কর্মীর তুলনায় কর্মীর পেশা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে কর্মীকে কর্মী হিসেবে না দেখে মানব সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বহুজাতিক কোম্পানির বিকাশসহ নানান কারণে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৫০ সালের পর বিশেষ করে আশির দশকে বিশ্বায়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধারণা বিকাশের ফলে কর্মী ব্যবস্থাপনা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরিত হয়। কর্মী ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য ছিল কর্মীদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করা। কিন্তু মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের মধ্যে অঙ্গীকার সৃষ্টির উপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। এ সময় কর্মক্ষেত্রে সকল ধরনের বৈষম্য দূর, শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ, কর্মীদের সকল অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের পেশা উন্নয়নের উপর ব্যাপক গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

সাম্প্রতিককালে অনেক কোম্পানিই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের উপর ন্যস্ত করেছে। ফলস্বরূপ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি এ বিভাগকে মানব সম্পদ বিভাগ নামে আখ্যায়িত করছে। ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রের সৃষ্ট জটিলতা, উন্নত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রমিক সচেতনতা, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়গুলো মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কার্যকর ও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
উপরোক্ত আলোচনা হতে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস এক দিনের নয়। এটি দীর্ঘদিনের ইতিহাস। কখনও যুগের প্রয়োজনে, কখনও প্রযুক্তি পরিবর্তনের কারণে আবার কখনওবা মানুষের ধ্যান-ধারণা পরিবর্তনের কারণে আজকের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্ভব হয়েছে। আধুনিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পিছনে কাজ করেছে অনেক গবেষণাবিদদের নিরলস সাধনা ও পরিশ্রম।
