মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন ও ক্রমবিকাশ এর ধারাবাহিকতা মূলত শুরু হয় ইংল্যান্ডের শিল্প-বিপ্লবের পর থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইংল্যান্ডে যখন শিল্প বিপ্লব সংগঠিত হয় তখনই শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎপাদন ও বিশেষায়নের সূত্রপাত ঘটে। এমতাবস্থায় এ পরিস্থিতিকে সামলে ওঠার জন্য কারখানাকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হয়।

তখন থেকেই প্রকৃত পক্ষে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন ও ক্রমবিকাশ শুরু হয়। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ক্রমবিকাশের ধারাকে প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। যা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।

 

মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

চিত্র : মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিবর্তন ধারা

শিল্প-বিপ্লবের পর থেকেই মূলত শিল্প ক্ষেত্রে বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হয় এবং তার ফলে এই সময় থেকে কারখানার কর্মীদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। ১৮১৩ সালে রবার্ট ওয়েন (Robert Owen) নামে একজন বৃটিশ বস্ত্রকল ব্যবসায়ী তার কারখানার শ্রমিকদের জন্য বেশকিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এগুলোর মধ্যে শ্রমিক-কর্মীদের স্বাস্থ্যরক্ষাসহ শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ ছিলো অন্যতম।

এছাড়াও তিনি সে সময় “A new view of society” নামক একটি পুস্তক রচনা করেন যার মধ্যে তিনি কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করেন। তখনকার সময়ে সংগঠনের শ্রমিক কর্মীদের কল্যাণের বিষয়টি ছিলো খুবই অবহেলিত। কারণ সেই সময়ে শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়ে কথা বলার কেউ ছিলোনা।

সেই সময়ে শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি মূলত নির্ভর করত কারখানার Foreman দের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। তখনকার সময়ে শ্রমিকদের শুধুমাত্র যন্ত্র বা উৎপাদনের উপাদান ছাড়া আর কিছু মনে করা হতো না । এরপর ১৯২১ সালে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির জনক FW Taylor তার রচিত Pinciple of Scientific Management গ্রন্থে মানসিক বিপ্লব, পার্থক্যমূলক মজুরি হার প্রথা, কার্যভিত্তিক Foremanship, Employment Bureau ইত্যাদি ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করেন।

পরবর্তীতে Henri Fayol তাঁর রচিত “General & Industrial Management নামক গ্রন্থে ব্যবস্থাপনার ১৪টি মূলনীতি সুপারিশ করেন যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর পর পরই বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের কল্যাণার্থে Welfare Work নামে একটি শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে।

 

এর ফলে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিল্পমালিকগণ তাদের শিল্প কারখানা Social or Welfare Secretaries নামক একজন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করেন এবং ঐ পদে নিয়োগদান শুরু করেন। এর ফলস্বরূপ ১৯২২ সালে শিল্প প্রতিষ্ঠানে আলাদা কর্মী বিভাগ প্রবর্তিত হয় ।
১৯১৩ সালে হুগোমুনস্টারবার্গ “Psychology and Industrial Efficiency” নামক একটা গ্রন্থ প্রকাশ করেন যাতে কর্মী ও তাদের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে নানা সুপারিশ করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শিল্প কারখানাতে শ্রমিক সচেতনতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় যার ফলে ১৯১৮ সালে ইংল্যান্ডে “Industrial Welfare Society” নামক একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এর পাশাপাশি সেই সময়ের শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সমাধানকল্পে “Fatigue Research Board” গঠিত হয় যা পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে নাম পরিবর্তিত হয়ে “Industrial Health Research Board” নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

পরবর্তীতে ১৯২১ সালে National Institute of Industrial Psychology নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে যার মূল কাজ ছিলো সংগঠনে শ্রমিক নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। ১৯২৪-৩২ সাল পর্যন্ত Western Electric Company এর Hawthorne Plant এর Hawthorn পরীক্ষার মাধ্যমে Elton Mayo ও তাঁর সহকর্মীগণ শ্রমিকদের সামাজিক ও মানবিক দিক নিয়ে বিস্তর গবেষনা করেন, যা কর্মী ব্যবস্থাপনা আন্দোলনে ব্যাপক অবদান রাখে ।

১৯২৪ সালে “Institute of Industrial Workers Welfare” প্রতিষ্ঠিত হয় যা ১৯৩১ সালে Institute of Labor Management এবং ১৯৪৬ সালে Institute of Personnel Management হিসাবে নামকরণ করা হয়। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কর্মীব্যবস্থাপনা বা Personnel Management ব্যাপক প্রসার লাভ করে, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪০-১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানে আলাদা নিয়োগ বিভাগ চালু করা হয়।

ইতোমধ্যে British Institute of Personnel Management, American Society for Personnel Administration ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিকসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে নানা ধরনের কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয়। এভাবেই বর্তমান সময়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ বা শিল্প সম্পর্ক বিভাগের সুচনা ঘটে এবং মূলত এটিই ছিলো HRM এর ক্রমবিবর্তন।

সর্বশেষে ১৯৮০ এর দশকে উন্নত প্রযুক্তি, অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং তীব্র ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে শিল্প ও ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে কর্মী ব্যবস্থাপনার সংকীর্ণ পরিধিকে সম্প্রসারণ করার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে। শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ তথা কর্মকর্তা কর্মচারীদের সার্বিক উন্নয়নকল্পে উন্নত বিশ্বে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা HRM হিসাবে নতুন একটি বিষয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

প্রতিষ্ঠানের সমগ্র মানব সম্পদের উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও কল্যাণ নিশ্চিতকরনই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য ।

 

মানব সম্পদ ব্যস্থাপনার বিবর্তন বা ক্রমোবিকাশ

চিত্র : মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ

Leave a Comment