ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

Table of Contents

ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক বা নির্বাহীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব, সামর্থ্য ও কার্যক্ষমতার উন্নয়নের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন। তবে ব্যবস্থাপনা বা নির্বাহী উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোকে দুইটি দিক থেকে বিবেচনা করা যায়।

একটি হচ্ছে কাজের মাধ্যমে উন্নয়ন পদ্ধতি আর অন্যটি হচ্ছে কাজ বহির্ভূত উন্নয়ন পদ্ধতি। নিম্নে কাজের মাধ্যমে উন্নয়ন ও কাজ বহির্ভূত উন্নয়ন পদ্ধতিগুলো আলোচনা করা হলো:

 

ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

চিত্র : ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন পদ্ধতি

কাজের মাধ্যমে ব্যবস্থাপক উন্নয়ন পদ্ধতিসমূহ (On the job development methods):

এই পদ্ধতিসমূহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে থেকে ব্যবস্থাপকগণের সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো হয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণকে হাতে কলমে কার্য-সম্পাদন শিখিয়ে বিভিন্নমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যই এই পদ্ধতিসমূহ ব্যবহার করা হয়। নিম্নে কাজের মধ্যে ব্যবস্থাপক উন্নয়ন পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো:

আন্ডার স্টাডি বা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (Understudy method):

এই পদ্ধতিতে সাধারণত দক্ষ ব্যবস্থাপকদের অনুপস্থিতিতে তাদের পদের দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত নবীন ব্যবস্থাপকদের দ্বারা পালনের জন্য উপযোগী করে তোলা হয় । এই পদ্ধতির আওতায় অপেক্ষাকৃত নবীন ও পদোন্নয়নের উপযোগী ব্যবস্থাপকগণ দক্ষ ও অভিজ্ঞ নির্বাহীদের তত্ত্বাবধানে থেকে নির্দিষ্ট পদের দায়িত্বপালন সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে।

পদ আবর্তন (Job rotation) :

এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপককে সাধারণত বিভিন্ন সমান্তরাল পদ বা বিভাগে স্থানান্তর করে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্য সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। পদ আবর্তন পদ্ধতি ব্যবস্থাপকদের কাজের একঘেয়েমি দূর করে এবং বিভিন্ন প্রকার কাজ সম্পর্কে দক্ষতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করে। আর এই কারণেই এই পদ্ধতি ব্যবস্থাপক উন্নয়নের একটি সু-পরিচিত ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।

কোচিং পদ্ধতি (Coaching method) :

এই পদ্ধতিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকগণ প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, উপদেশ ও পরামর্শদানের মাধ্যমে তাদের আত্মোন্নয়নে সক্রিয়া ভূমিকা রাখে। এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকগণ কার্যক্ষেত্র সম্পর্কে বাস্তবজ্ঞান লাভ করে। কোচিং পদ্ধতির সফলতা মূলত নির্ভর করে নির্দেশণাদানকারী কোচ বা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকের জ্ঞান, দক্ষতা, শেখানোর ইচ্ছা এবং মানসিকতার ওপর ।

কমিটির সদস্য পদ (Committee membership):

এই পদ্ধতিতে নবীন ব্যবস্থাপকগণকে বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞানদান করা হয়। কমিটির সদস্য পদ পদ্ধতিতে নবীন ও শিক্ষার্থী ব্যবস্থাপকগণ কমিটির অন্যান্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক সদস্যদের সান্নিধ্যে এসে তাদের কর্মপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং বিভিন্ন জটিল সমস্যার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে ।

 

নির্বাচিত বিষয় অধ্যয়ন (Selective subject study):

এই পদ্ধতিতে নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপকদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকার বই-পুস্তক, জার্নাল, ম্যাগাজিন, নিবন্ধ ইত্যাদি পাঠের সুযোগ করেদেয়। এইগুলো অধ্যায়ণ করে নবনিযুক্ত নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকগণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নসংক্রান্ত নানাবিধ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারে এবং এই সব সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত নিজেদের মধ্যে আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে।

বিশেষ প্রকল্প এবং টাস্কফোর্স (Special project and task force):

এই পদ্ধতির আওতায় প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপককে তার কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনো প্রকল্প ও টাস্কফোর্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। এই সমস্ত প্রকল্প ও টাস্কফোর্সে কাজ করার মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপক বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে পারে এবং সেগুলো সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

কাজের বাইরে ব্যবস্থাপক উন্নয়ন পদ্ধতিসমূহ (Off the job development methods):

প্রতিষ্ঠানের কাজের বাইরেও বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপকদের উন্নয়ন ঘটানো যেতে পারে। নিম্নে কাজের বাহিরে ব্যবস্থাপক উন্নয়নের বিভিন্ন পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো-

বিশেষ কোর্স:

এই পদ্ধতির আওতায় প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য পাঠানো হয়। এইসব কোর্সে অংশগ্রহণ করে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকগণ সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জ্ঞানলাভ করতে পারে এবং কার্যক্ষেত্রে ঐ বিষয়ে পারদর্শিতা দেখাতে পারে।

সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ (Sensitivity training):

এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকগণ অথবা নির্বাহীগণ যেন নিজেদের মধ্যে নেতৃত্ব উন্নয়ন, অনুভূতি প্রবণতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি ও মনোভাব সংশোধন করতে পারে সেই জন্য দলীয়ভাবে মুক্ত আলোচনা ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

সংবেদনশীলতা বা অনুভূতিপ্রবণ প্রশিক্ষণ ১৯৫০ সাল থেকে দলগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আচরণ পরিবর্তনের একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মনোবিজ্ঞানীরা এই ধরনের সংবেদনশীলতা ও অন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্স (Seminar, workshop, conference ) :

প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের ধারণাগত ও বিশ্লেষণগত সামর্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্স ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকগণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং খোলাখুলি মতামত বিনিময়ের মাধ্যমে নানা ধরনের জ্ঞান লাভ করতে পারেন।

বক্তৃতা (Lecture):

এই পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ (Resource Person) দ্বারা বিভিন্ন কোর্সের মাধ্যমে বক্তৃতার ব্যবস্থা করা হয়। ব্যবস্থাপকীয় সার্বিক কার্যক্রমসম্পর্কীয় তাত্ত্বিক জ্ঞানদানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কৌশল হিসাবে বক্তৃতা পদ্ধতি ব্যাপক প্রচলিত একটি পদ্ধতি।

বক্তৃতার শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞগণ প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের খুঁটি নাটি প্রশ্নের উত্তর দেন। আর এর ফলে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের কাছে বক্তৃতার বিষয়বস্তু আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সিন্ডিকেট পদ্ধতি (Sindicate method):

এই পদ্ধতির আওতায় প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপকদের কতিপয় ছোট ছোট দলে বিভক্ত করা হয় । প্রতিটি দলকে একটি সিন্ডিকেট বলে। বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত নির্বাহীদের নিয়ে সিন্ডিকেটগুলো গঠিত হয়। সিন্ডিকেটের আওতায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও মতামত বিনিময় করা হয়।

 

ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বা নির্বাহী উন্নয়ন পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ

 

ব্যবসায়িক সফর (Business tour):

এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী ব্যবস্থাপক বা নির্বাহীদের দেশী বিদেশি বিভিন্ন বৃহদায়তন ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যবসায়িক সফরের মাধ্যমে সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করিয়ে ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পদ্ধতি, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ও কার্যপদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা বা নিবার্হী উন্নয়নের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবসায়িক সফল খুবই কার্যকরি।

Leave a Comment