কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন সব প্রতিষ্ঠানে এক রকম নয়। প্রতিষ্ঠান ভেদে এটা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে তাকে। মূলত প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাজের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন
পদ্ধতিকে সাধারণত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যেমন:

১। অবিমিশ্র মান মূল্যায়ন Absolute standard)

২। তুলনামূলক মান মূল্যায়ন (Relative standard)

৩। উদ্দেশ্যভিত্তিক মান মূল্যায়ন (Objective standard)

৪ । অন্যান্য (Others)

অবিমিশ্র মান মূল্যায়ন ( Absolute standard):

বর্ণনামূলক প্রবন্ধ মুল্যায়ন, পরীক্ষা তালিকা মূল্যায়ন, সংকটপূর্ণ ঘটনা মূল্যায়ন, লেখচিত্র, রেটিং স্কেল মূল্যায়ন, বাধ্যতামূলক পছন্দ মূল্যায়ন অবিমিশ্র মান মূল্যায়ন পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে এইগুলো আলোচনা করা হলো :

বর্ণনামূলক প্রবন্ধ মূল্যায়ন (Descriptive esay appraisal):

এই পদ্ধতিতে মূল্যায়নকারী কর্মীর সবলতা, দুৰ্বলতা, অতীত কার্যসম্পাদন, সম্ভাবনা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুপারিশসম্বলিত একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের প্রবন্ধ বা রিপোর্ট উপস্থাপনের মাধ্যমে কর্মীর কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন করে থাকেন। এটি কর্মীর কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের সহজতম পদ্ধতি হলেও এটি অকাঠামোগত হওয়ার কারণে রচনার বিষয়বস্তু ও বিস্তারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির মূল্যায়নের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়।

সংকটপূর্ণ ঘটনা মূল্যায়ন (Critical incident appraisal):

কর্মীরা তাদের কার্যক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এই রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে কর্মীরা কেমন আচরণ করে তা লিপিবদ্ধ করা হয় এবং পরে তা মূল্যায়ন আকারে উপস্থাপন করা হয়। ১৯৫৫ সালে Flanagan এবং Burns এবং ১৯৫৭ সালে Kirehner এবং Dunnettec & Bridgman এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

লেখচিত্র রেটিং স্কেল মূল্যায়ন (Graphic rating scale appraisal):

এই মূল্যায়ন পদ্ধতিকে গুণগত রেটিং স্কেল মূল্যায়নও বলা হয়ে থাকে। লেখচিত্র রেটিং স্কেল মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রাচীন এবং বহুল ব্যবহৃত একটি কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কর্মীদের মূল্যায়নযোগ্য অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলিকে কর্মীর ভূমিকা ও অর্জনের মাত্রা অনুযায়ী ছোট ছোট বৃত্তের দ্বারা লেখচিত্রের উপস্থাপন করা হয়। চিত্রে বৃত্তের অবস্থান দেখে কর্মী সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করা যায়।

Decenzo ও Robbins এর মতে, “গুণগত রেটিং স্কেল হচ্ছে এরূপ একটি কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন পদ্ধতি যা প্রত্যেকের জন্য কতিপয় গুণাবলি এবং কার্যসম্পাদনের মাত্রার একটি তালিকা ব্যবহার করে মূল্যায়ন করা হয়। কাজের মান ও পরিমাণ, কাজসম্পর্কিত জ্ঞান, সহযোগিতা, আনুগত্য নির্ভরশীলতা, উপস্থিতি, সততা, সংহতি, মনোভাব, ঝোঁক, উদ্যোগ, নেতৃত্বের দক্ষতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা, আবেগ, মননশীলতা ইত্যাদি গুণাবলি বা উপাদানসমূহের মাত্রা নিরূপণের উদ্দেশ্য রেটিং স্কেল ব্যবহার করা হয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে কোনো বিশেষ কাজের জন্য কর্মীর কার্যসম্পর্কিত জ্ঞান, কাজের মান, সততা, নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, নির্ভরশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এই পাঁচ ধরণের গুণাবলি প্রয়োজন। এখন এই পাঁচ ধরণের গুণাবলিকে কর্মীর ভূমিকা ও অর্জনের মাত্রা অনুযায়ী লেখচিত্রে উপস্থাপন করা হলো । নিম্নের এই লেখচিত্রে OX অক্ষ দ্বারা কর্মীর বৈশিষ্ট্য বুঝানো হয়েছে এবং OY অক্ষ দ্বারা কর্মীর অর্জনের মাত্রা বুঝানো হয়েছে।

 

কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

চিত্রে : মূল্যায়ন যোগ্য কর্মীদের অত্যাবশকীয় গুণাবলীকে দেখানো হলো

তুলনামূলক মান মূল্যায়ন (Relative standard):

এই ধরনের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াগুলোতে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের আলোকে কর্মীদেরকে তুলনামূলক মানে বিচার করা হয়। পর্যায়নুবৃত্তিক র‍্যাঙ্কিং মূল্যায়ন, বাধ্যতামূলক বণ্টন পদ্ধতি, গ্রুপ অর্ডার র‍্যাঙ্কিং, নম্বর পদ্ধতি, জোড়া তুলনামূলক মূল্যায়ন ইত্যাদি তুলনামূলক মান মূল্যায়ন পদ্ধতির অন্তর্ভুত। নিম্নে তুলনামূলক মান মূল্যায়ন পদ্ধতির আওতাভুক্ত পদ্ধতিগুলো বর্ণনা করা হলো:

পর্যায়নুবৃত্তিক র‍্যাঙ্কিং মূল্যায়ন (Alternation ranking appraisal):

Gary Dessler এর ভাষায়, “পর্যায়ক্রমবৃত্ত শ্রেণিবদ্ধকরণ মূল্যায়ন হচ্ছে কর্মীদের এরূপভাবে শ্রেণিবদ্ধকরণ যা বিশেষ গুণাবলির ভিত্তিতে সর্বোত্তম থেকে সর্বনিম্ন, প্রথমে সর্বোচ্চ, তারপর সর্বনিম্ন, এভাবে সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত র‍্যাঙ্কিং করা হয়। এই পদ্ধতিতে কর্মীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়।

তারপর নির্দিষ্ট “ফরম” এর মধ্যে মূল্যায়িত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি নম্বর প্রাপ্ত কর্মী এবং সবচেয়ে কম নম্বর প্রাপ্ত কর্মীদের চিহ্নিত করে লিপিবদ্ধ করা হয়। অতঃপর পরবর্তী সর্বোচ্চ এবং পরবর্তী সর্বনিম্ন নম্বর প্রাপ্ত কর্মীদের চিহ্নিত করে লিপিবদ্ধ করা হয়। এভাবে পর্যায়নুবৃত্তিক সর্বশেষ পর্যন্ত কর্মীর র‍্যাঙ্কিং করা হয়।

বাধ্যতামূল্যক বণ্টন পদ্ধতি (Forced distribution appraisal):

বাধ্যতামূলক বণ্টন পদ্ধতিতে কর্মীদেরকে একাধিক দলে বিভক্ত করা হয় এবং তাদের দক্ষতা মূল্যায়নের বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। এরপর থেকে তাদেরকে পূর্বনির্ধারিত শতকরা হার অনুযায়ী নম্বর বণ্টনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।

নম্বর পদ্ধতি (Paint system):

এই পদ্ধতিতে কোনো কার্য সম্পাদনের জন্য কর্মীদের আবশ্যকীয় গুণাবলিসমূহ প্রথমে চিহ্নিত করা হয় এবং ঐসব গুণাবলির বিপরীতে নম্বর প্রদান করা হয়। এরপর কর্মীর ঐসব গুণাবলির বিপরীতে প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে সর্বমোট নম্বরের ভিত্তিতে কর্মীর কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন করা হয়।

উদ্দেশ্যভিত্তিক মূল্যায়ন (Objective standard) :

গোপনীয় প্রতিবেদন ও উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্দেশ্যভিত্তিক মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে গোপনীয় প্রতিবেদন ও উদ্দেশ্য ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

 

গোপনীয় প্রতিবেদন (Confidential report):

এই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁর অধস্তনদের ব্যক্তিগত, চারিত্রিক এবং কার্যসম্পাদনসংক্রান্ত বিষয়াবলির পর্যবেক্ষণ করেন এবং পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তিকরে মতামত দিয়ে একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং তা প্রশাসন বা মানব সম্পদ বিভাগে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

এই পদ্ধতিটি সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের জন্য বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতি। এটি কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের একটি সনাতন পদ্ধতি এবং এটি সাধারণত বৎসরে একবার করা হয়।

উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Management by Objective):

উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ১৯৩০ সালে প্রবর্তিত একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি যা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ বা কর্মী মূল্যায়ন সহ ব্যবস্থাপনার বহুবিধ দিকে প্রয়োগ করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশ জনপ্রিয় কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন পদ্ধতি হলো উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (MBO)। উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীর জন্য সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং নির্দিষ্ট সমায়ন্তর সেই লক্ষ্যের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।

এই উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে লক্ষসমূহ ব্যবস্থাপক ও অধস্তন মিলে যৌথভাবে চিহ্নিত করে তা অর্জনের জন্য সচেষ্ট হয়।

 

কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের পদ্ধতি বা কৌশল

চিত্র : কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন পদ্ধতি

Leave a Comment