কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি । যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ১এর অন্তর্গত।

উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি

 

উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি

উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি জোর দেয় যে, মানব সম্পদ কৌশলসমূহ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ পরিস্থিতি ও ধরনের উপর ভিত্তি করে প্রণীত ও প্রয়োগ হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ও মানব সম্পদ কৌশলের মধ্যে সংযুক্ততার মাধ্যমে ‘উ’কৃষ্ট মানানসই’-এর অর্থ প্রকাশ করা যেতে পারে। উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি মডেলের তিনটি অংশ রয়েছে। নিচে এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

 

জীবন চক্র মডেল:

জীবন চক্র মডেলটি এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গঠিত যে, একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ঘটে চারটি স্তরে, যেমন- শুরু, উন্নয়ন, পূর্ণতা ও পতন। এটি পণ্যের জীবন চক্রের মতো ।

বেয়ার্ড ও মেসোলাম (Baird and Meshoulam) কর্তৃক প্রথম এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি প্রকাশ করা হয়। তারা বলেন যে, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পর্যায়ের সাথে উৎকৃষ্ট মানানসই কার্য পদ্ধতির উপর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ফলপ্রাপ্তি নির্ভর করে। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের সাথে সাথে এর প্রয়োজন মিটানোর জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি, প্রয়োগ ও পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধি ও উন্নয়নের সাথে সাথে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনারও কয়েকটি ধাপে উন্নয়ন সাধন করতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠান ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে ।

বোলার ও নেপিয়ার (Buller and Napier) বলেন, প্রতিষ্ঠানের শুরুর পর্যায়ে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ঢিলেঢালা ও অনানুষ্ঠানিক হতে পারে। কারণ এটি এ পর্যায়ে মালিক বা প্রতিষ্ঠাকারী দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রতিষ্ঠানের বিক্রি হঠাৎ করে খুব বেড়ে গেলে এবং বাজারে নতুন পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে মালিক ও লাইন ম্যানেজারের পক্ষে এ বিপুল চাহিদা মিটানো বা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

তাই প্রতিষ্ঠান তার পক্ষে এ বড় চাহিদার প্রতি সাড়া দিতে পারে এমন আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে এবং কার্য বিশেষজ্ঞ সম্পন্ন মানব সম্পদ যুক্ত করে। এ প্রবৃদ্ধির সময়ে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা হলো সঠিক কাজের জন্য সঠিক কর্মী আকৃষ্ট করা এবং একই সাথে উদ্ভাবন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা, মেধা ব্যবস্থাপনা, কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও উন্নয়ন এবং পুরস্কার পলিসি ও প্রয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া।

আবার, প্রতিষ্ঠান যখন পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়, তখন মানব সম্পদ কম উদ্ভাবনী হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকে তাকিয়ে বর্তমান বা চলমান কার্যক্রমের প্রয়োগকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।

পতন স্তরে মানব সম্পদ পূর্ণতা স্তরের কার্যক্রমকে ধরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা নাও করতে পারে। তখন মানব সম্পদ বিভাগ চিন্তা করতে পারে যে, কীভাবে কর্মীদেরকে কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ছোট করা যায়। তখন তারা এ ধরনের জটিল ও কঠিন সিদ্ধান্তে জড়িয়ে যেতে পারে।

এ হলো আপাতদৃষ্টে ঘটতে পারে এমন চিত্র। তবে এ চিত্র বিভিন্ন প্রত্যক্ষ গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়- সুলার ও জ্যাকসন (Schuler and Jackson) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণতাপ্রাপ্ত পর্যায়ের পণ্যের চেয়ে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির পর্যায়ে (Growth stage) মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবন ও পরিকল্পনার দিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশি নজর দিয়ে থাকে। কিন্তু এ মডেলটি হলো- যা ঘটতে পারে তা-ই; যা ঘটা উচিত তা নয়। (But it is a model of what might happen rather than what should happen)

এক্ষেত্রে পূর্ণতাপ্রাপ্ত স্তরে (Mature stage) প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতর সময় মানব সম্পদ বিভাগ কেন শৈথিল্য প্রদর্শন করে তার কোনো ভালো কারণ জন্য নেই। এটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তবে এ মডেল মানব সম্পদ পরিকল্পনাকারীদেরকে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণমূলক হাতিয়ার হিসেবে সতর্কবার্তা দিতে পারে যে, প্রতিষ্ঠানে কী ঘটছে।

 

সর্বোৎকৃষ্ট কার্যোপযোগিতা এবং প্রতিযোগিতামূলক কৌশলসমূহ:

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য তিন ধরনের কৌশল চিহ্নিত করেছেন পোর্টার (Porter) :
১। উদ্ভাবন (Innovation) : ভালো উৎপাদনকারীই উদ্ভাবন করেন;
২। মান (Quality) : ক্রেতাদেরকে উচ্চমানের পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে;
৩। ব্যয় কমানো (Cost leadership) : পরিকল্পিত ফল অর্জনের উদ্দেশ্যে খরচ কমায়।

সুলার ও জ্যাকসন (Schuler and Jackson ) তাদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে বলেন যে, পদ্ধতিগতভাবে মানব সম্পদ প্রয়োগ এবং নির্বাচিত প্রতিযোগিতামূলক কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। তারা তিনটি কৌশলের যে কোনোটি বা সবগুলোর আলোকে মানব সম্পদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন।

 

কৌশলগত যন্ত্রবিন্যাস বা কাঠামো:

দিলারি ও ডটি (Delery and Doty) উল্লেখ করেন যে, সর্বোৎকৃষ্ট উপযুক্ততার জন্য অন্য আরেকটি কার্যপদ্ধতি হলো যদি Se প্রতিষ্ঠান কৌশলগত (configuration) নীতি গ্রহণ করে, তা হলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

দিলারি ও ডটি কর্তৃক প্রদত্ত তাদের এ কৌশলটি মিন্টজবার্গ (Mintzberg) এবং মাইলস ও স্লো (Miles and Snow) কর্তৃক প্রদত্ত তত্ত্বের সাথে মিলিয়ে দেখেছেন যে, এটি ঠিক আছে। এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে। এতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় ৷

 

একটি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করার ৫টি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন মিন্টজবার্গ (Mintzberg)। এগুলো হলো:

(i) সাধারণ কাঠামো;
(ii) মেশিন আমলাতন্ত্র;
(iii) পেশাগত আমলাতন্ত্র;
(iv) বিভাগীয়করণের আকার; এবং
(v) খণ্ডকালীন কাজের নীতিমালা ।

মাইলস ও স্নো (Miles and Snow) চার ধরনের প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেন, যার প্রথম তিনটি প্রত্যেক আদর্শ প্রতিষ্ঠানে নিহিত থাকে। এগুলো হলো:

 

১। সন্ধানকারী (Prospector) :

এটি এমন প্রতিষ্ঠান যা দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ধারণা করা যায় না এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে। তারা নতুন পণ্য, বাজার ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে এ পরিবেশকে সাড়া প্রদান করে। তারা মানব সম্পদের এমন পরিবর্তন সাধন করে, যেন প্রতিযোগীরা সাড়া প্রদানে বাধ্য হয়। প্রসপেক্টরের আনুষ্ঠানিকতা ও বিশেষীকরণের সুযোগ একেবারেই কম; কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ ও পর্যায় অনেক বেশি। তাদের ক্রমপর্যায়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।

 

২। রক্ষক (Defender) :

এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অধিক স্থায়ী ও অনুমান করা যায় এমন পরিবেশে কাজ করে এবং Set দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জড়িত থাকে। তারা তাদের বাজারকে সুরক্ষিত করতে সচেষ্ট থাকে এবং খুব কমই গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ করে।

এ ধরনের সংগঠন নিয়মিত কর্মসূচি অনুযায়ী ও উৎপাদনে সর্বোচ্চ মিতব্যয়িতা অর্জনের জন্য দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দেয়। তাদের প্রসপেক্টরের চেয়ে অধিক যান্ত্রিক বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামো রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকতা, কেন্দ্রীকতা, বিশেষীকরণ ও উল্লম্ব বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে সমন্বয় অর্জন করে ।

 

৩। বিশ্লেষণ (Analyser) :

এ ধরনের সংগঠন হলো প্রসপেক্টর ও ডিফেন্ডারের সমন্বিত রূপ। তারা ডিফেন্ডারের মত স্থায়ী পরিবেশে কাজ করে এবং বাজারও সেরকম হবে যেখানে নতুন পণ্যের প্রয়োজন হয় সবসময়। তারা প্রসপেক্টরের মতো পরিবর্তন প্রয়াসী নয়; কিন্তুডিফেন্ডারের চেয়ে দ্রুত পরিবর্তনকে অনুসরণ করে।

তারা দক্ষতা ও নতুন বাজার ধরার মাধ্যমে নিজেদের কাঠামোকে অধিক ফলপ্রসূ করতে চায়। এ ধরনের দ্বৈততার অনুসরণ ফলাফলের আকার বাড়ায়। কারণ, এতে তাদেরকে অধিক উৎপাদন এবং গবেষণা ও উন্নয়নের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তারা উচ্চতর আন্তঃনির্ভরশীলতাও দেখাতে পারে ।

 

৪। বিক্রিয়ক (Reactor) :

এটি হলো অস্থায়ী সংগঠন যা অনুমানযোগ্য নয় এমন পরিবেশে কাজ করে। তাদের কোনো সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সুসংবদ্ধ কৌশল নেই এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে না ।

দিলারি ও ডটি (Delery and Doty) পরামর্শ দেন যে, প্রতিষ্ঠানের উচিত কৌশলগত কাঠামোসমূহ একত্র করে তাদের মানব সম্পদ সিস্টেম তৈরি করা। দুটি সিস্টেম চিহ্নিত করা হয়।

 

(i) বাজার সিস্টেম (Merket system) :

এ সিস্টেমে প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে প্রধানত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, , অভ্যন্তরীণ পদক্রম (Ladder) খুব কমই অনুসরণ করা হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, ফলাফল অনুযায়ী কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা, চাকরির পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং কাজের স্পষ্ট বিবরণ নেই।

 

(ii) অভ্যন্তরীণ সিস্টেম (Internal system) :

এ সিস্টেমে অভ্যন্তরীণ কর্মীদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হয়, পদক্রম অনুসরণ করা হয় পুংখানুপুংখভাবে; আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষন ব্যবস্থা রয়েছে; আচরণগত দিক বিবেচনায় রেখে কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন করা হয়, পর্যাপ্ত সাধারণ নিরাপত্তা ও চাকরির নিরাপত্তা রয়েছে, চাকরির স্পষ্ট বিবরণ থাকে।

 

প্রসপেক্টর (Prospector) কৌশলের জন্য বাজার সিস্টেম উপযোগী। অন্যদিকে, ডিফেন্ডার (Defender) কৌশলের জন্য অভ্যন্তরীণ সিস্টেম প্রয়োজন। তবে দিলারি ও ডটি (Delery and Doty) বিশ্লেষক কৌশলের (Analyser) জন্য কোন্ কৌশল উপযোগী সে সম্পর্কে কোনো মতামত বা পরামর্শ দেননি।

তবে অনুমান করা যায় যে, এটির জন্য হাইব্রিড বাজার সিস্টেম (Hybrid Market System) উপযোগী হতে পারে। Delery and Doty কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা হতে প্রতীয়মান হয় যে, Miles and Snow কর্তৃক প্রদত্ত তত্ত্বের উচ্চ উৎপাদনশীল মূল্য রয়েছে।

অন্যভাবে বলা যায় যে, উক্ত তত্ত্বের উপযুক্ততার (fit) সাথে (যেমন: কাঠামো, কৌশল ও অন্যান্য বিষয়) প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার যৌক্তিক ও শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে। যাই হোক তারা সুস্পষ্টভাবেই Activa বলেছেন যে, বিভিন্ন গবেষণা বা তত্ত্বের কারণে হয়ত প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা সাময়িকভাবে নষ্ট হতে পারে।

 

উৎকৃষ্ট মানানসই কার্যপদ্ধতি

 

তবে একই ধরনের গবেষণার Mintzburg প্রতিষ্ঠানের ধরন, উপযুক্ততা ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদনশীলতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো S সম্পর্ক পাননি।

Leave a Comment