আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৌশলের প্রকারভেদ । যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ২ এর অন্তর্গত।
Table of Contents
কৌশলের প্রকারভেদ
প্রতিষ্ঠান ও প্রকৃতিভেদে কৌশল বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। প্রতিষ্ঠান কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে এবং তার লক্ষ্য কী তার উপর এটা নির্ভর করে। যা হোক বর্তমান পরিসরে নিম্নে বিভিন্ন ধরনের কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

চিত্র : কৌশলের প্রকারভেদ
পরিবর্তন সূচনাকরণ কৌশল:
প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে এ জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা হয়। পরিবর্তন সূচনাকরণ কৌশল নিম্নরূপ:
ক ) আকস্মিক আক্রমণাত্মক কৌশল:
এতে হঠাৎ করে পরিবর্তনের সূচনা করা হয়। যেমন- কোনো একজন কর্মচারিকে ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কার্যকর করা উচিত। কারণ আস্তে-ধীরে ছাঁটাই করলে অন্যান্য কর্মচারীগণ তা জানতে পারে বা তারাও চাকরির নিরাপত্তার অভাববোধ করতে পারে। এতে তাদের মনোবল ও কার্যোদ্যম হ্রাস পেতে পারে ।
খ) ‘ধীরে চল’ কৌশল:
এটা হলো আকস্মিক আক্রমণাত্মক কৌশলের ঠিক বিপরীত। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কোনো নতুন ধারণা বা পদ্ধতিকে ধীরে ধীরে কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ নতুন ধারণা প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হবার পর তা কার্যকর করা হয়।
গ) তড়িৎ কার্যফল দেখাও কৌশল:
এটি এমন এক ধরনের স্ট্র্যাটেজি যেখানে কোনো নতুন বিষয়ের প্রতি কর্মীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলে বা পরিবর্তনের ব্যাপারে ভুল ধারণার সৃষ্টি হলে তা দূর করা হয়। সেই সাথে এ বিষয়ে তাদেরকে সুফল প্রত্যক্ষ করানো করা হয়। যেন সকলেই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। এতে নতুন কোনো বিষয়ের প্রতি সন্দেহ দূরীকরণ ও সুফল প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিবর্তনের প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলকে আকৃষ্ট করে তোলা হয় ।
ঘ) ছোট থেকে বড় কৌশল:
এটা হলো একটা পরীক্ষামূলক কৌশল। এতে কোনো বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের যদি সন্দেহ থাকে বা তার গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, তা হলে কর্মসূচির ক্ষুদ্র অংশবিশেষ প্রয়োগ করা হয়। ফল ভালো বা আশাব্যঞ্জক হলে ধীরে ধীরে সার্বিক কর্মসূচি প্রয়োগ করা হয়।
ঙ) সমস্যার অভ্যন্তরে তলিয়ে দেখার কৌশল:
প্রতিষ্ঠানে যে কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে যা কর্মচারীগণকে হতাশ করে তোলে। এমতাবস্থায়, ব্যবস্থাপককে সমস্যাদির অভ্যন্তরে প্রয়োগ করে তার কারণ অনুসন্ধানপূর্বক সমাধান বের করতে হয়।
যৌথ প্রয়াসমূলক কৌশল:
এ জাতীয় কৌশলসমূহ দুই বা ততোধিক ব্যবস্থাপক বা নির্বাহী কর্তৃক অনুসৃত হয়। যৌথ প্রয়াস মূলক কৌশলসমূহ নিম্নরূপ:
ক) একতাই বল কৌশল:
প্রতিষ্ঠানের কোনো নির্বাহী নতুন কোনো প্রস্তাব বাস্তবায়ন করার জন্য অপরাপর নির্বাহীদের নিয়ে জোট গঠন করেন । কারণ ‘একতাই বল’-এর শক্তিতে তাদের কৌশল সুফল বয়ে নিয়ে আসে।
খ) অনিচ্ছুক মিত্র কৌশল:
এ কৌশলের অধীনে অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে মিত্র বানানোর চেষ্টা করা হয়। যদি কোন ব্যবস্থাপক বা নির্বাহী কোনো অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পন করলে যদি তিনি ঐ দায়িত্ব পালনে উৎসাহী ও তৎপর হন, সেক্ষেত্রে অনিচ্ছুক মিত্র কৌশল কার্যকরী হয়। এভাবে অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে মিত্র হিসাবে পাওয়া যায় ।
গ) ‘দেয়া-নেয়া কৌশল:
এটা ব্যতিহার কৌশল হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকে। পারস্পরিক সম্বন্ধের ভিত্তিতে এ ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়।
প্রতিরক্ষামূলক-কৌশল:
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কৌশলসমূহ বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীগণ নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এ জাতীয় কৌশল অনুসরণ করে থাকেন । প্রতিরক্ষামূলক কৌশলসমূহ নিম্নরূপ:
ক) ‘স্বীয় কার্যে অবিচল’-কৌশল:
এটা হলো নির্বাহী কর্তৃক কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে স্বীয় কার্য চালিয়ে যাওয়ার কৌশল। এতে কোনো দিক হতে সমালোচনা আসলেও নির্বাহী তা এড়িয়ে তার কার্য চালিয়ে যান। কারণ নির্বাহী নিজেই তার কার্যের উপর পূর্ণ আস্থাবান থাকেন ।
খ) নির্মল জল ঘোলা করা কৌশল:
এ ধরনের কৌশলে মূল ঘটনা বা বিষয় হতে মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে আসল বিষয়কে ঘোলাটে করা হয়। এ জাতীয় কৌশল রাজনীতিতে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানেও এর প্রয়োগ লক্ষ্যনীয়
গ) পালটা আক্রমণ কৌশল:
প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন ফ্যাশনের দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় সেবা ও কমিশন প্রদান করে থাকে। প্রতিযোগীদের চেয়ে অধিক বিক্রয়ের আশায় এরূপ সেবা, কমিশন ইত্যাদি প্রদানের প্রতিযোগীতাই এ ধরনের কৌশলের জন্ম দেয়।
ঘ) ঐক্যভাঙ্গন ও শাসন কৌশল:
এটা বিশেষত: রাজনৈতিক কৌশল। তবে এ ধরনের নীতি অবাঞ্চিত বা ক্ষতিকর হলেও তা কারবারী প্রতিষ্ঠানেও প্রয়োগ করা যায়। তবে এতে মারাত্মকভাবে কর্মীদের সহযোগীতা ব্যাহত হয়।
সাবধানতামূলক কৌশল:
সাবধানতামূলক কৌশলসমূহ প্রয়োগে খুবই কৌশলী ও কূটনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হয়। এগুলো নিম্নরূপ:
ক) অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর কৌশল:
অনেক সময় শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমঝোতা ও মতৈক্যে পৌছতে না পারলে প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট বা তালাবদ্ধ আন্দোলনের ন্যায় অবাঞ্ছিত ঘটনা দেখা দেয়। কিন্তু এর জন্য ব্যবস্থাপনা দায়ী করে শ্রমিকদেরকে, আর শ্রমিকরা দোষ চাপায় ব্যবস্থাপনার উপর ।
খ) ধরি মাছ না ছুঁই পানি কৌশল:
এটা হলো অপরের দ্বারা স্বীয় মতলব কৌশলী উপায়ে হাসিল করিয়ে নেয়া। এ ধরনের কৌশলে কাপুরুষতার লক্ষণ থাকলেও তা আইনসম্মত বলে বিবেচিত।
গ) বারুদ সংরক্ষণ করা কৌশল:
প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষে যখন তখন ছোট খাট ব্যাপারে বিশেষ চিন্তিত না হয়ে সংকটপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে অধিক মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন ।
চুক্তি সংক্রান্ত কৌশল:
চুক্তি সংক্রান্ত কৌশলসমূহ পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এ জাতীয় কৌশলসমূহ নিম্নরূপ:
ক) দরকষাকষি কৌশল:
সাধারণত ক্রয়-বিক্রয় কার্যে এ ধরনের কৌশল ব্যবহৃত হয়। মূলত বিরোধীভাবাপন্ন পক্ষদ্বয়ের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে এরূপ নীতি অনুসৃত হয় ।
খ) আলোচনা কৌশল:
এ ধরনের কৌশলে খোলাখুলি আলাপ আলোচনা করা হয়। এতে আন্তরিকতার অভাব থাকে না। সকলের প্রয়োজন উদ্দেশ্য ও দুর্বলতা ইত্যাদি খোলা মনে প্রকাশ করা হয় ।
গ) বিস্ময় সূচক কৌশল:
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এ জাতীয় কৌশল একটু ভিন্ন আঙ্গিকে প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় বিভিন্ন কোম্পানি পত্র-পত্রিকায় ‘?’,‘!’ ইত্যাদি চিহ্ন ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে জনগণকে বিজ্ঞাপনের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়।
সময় সংক্রান্ত কৌশল:
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সময় অর্থের চেয়েও মহামূল্যবান। তাই সময়কে কাজে লাগানোর জন্য ব্যবস্থাপকগণ নিম্নলিখিত কৌশলসমূহ প্রয়োগ করেন :
ক) লোহা গরম হলেই আঘাত কর কৌশল:
এর অর্থ হলো, অবস্থা অনুকূল হলেই দ্রুত কার্যসম্পাদন কর, প্রতিকূল অবস্থায় নয়।
খ) সময় বড় আরোগ্যকারী কৌশল:
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এমন কিছু কার্য আছে যেগুলো সম্পাদনে একটু বিলম্ব করলে অধিকতর সুফল লাভ করা যায়। কেননা, উত্তেজিত অবস্থায় কোনো বিতর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান সমীচীন নয়। উত্তেজনা প্রশমিত হলে বা কিছু সময় অতিবাহিত হলেই উক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান সমীচীন হতে পারে। এতে করে সঠিক সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায়।

গ) এক লম্ফ অগ্রে কৌশল:
কখনও কখনও দেখা যায় যে কিছু কিছু বড় কোম্পানি তাদের কর্মচারীদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য বেতনের বাৎসরিক বর্ধিত হার, বোনাস ইত্যাদি অন্যান্য কোম্পানির পূর্বেই ঘোষণা করে। এ ধরনের কৌশলকে এক লম্ফ অগ্রে কৌশল বলে ।
পরিশেষে বলা যায় যে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে কোনো কৌশলই সমান ফলদায়ক নয়। এক একটা কৌশল এক এক সময়ে ও পরিস্থিতিতে ফলদায়ক হয় ।
