কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কৌশল উন্নয়নের পর্যায়

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৌশল উন্নয়নের পর্যায় । যা বাউবি ওএসএমবিএ ২২০১ কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা – ইউনিট ২ এর অন্তর্গত।

কৌশল উন্নয়নের পর্যায়

কৌশল উন্নয়নের চারটি পর্যায় রয়েছে যা ১৯৪৫ সাল হতে শুরু হয়েছে। নিচে উক্ত পর্যায়সমূহ তুলে ধরা হলো:

পর্যায়-১ (Stage-1) :

১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ১৯৬০ এর শেষ অবধি বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি স্থির ছিল। তবে এটি সম্প্রসারিত অবস্থায় ছিল। অধিকাংশ অর্জনই যুদ্ধের কারণে কম প্রচার পেয়ে ছিল। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে উৎপাদনের পরিমান কম ছিল। এ সময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল। তখন উল্লেখযোগ্য পরিমান চাপা চাহিদা ছিল । প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ছিল সে সকল চাহিদা মোকাবিলা করা ।

এ পর্যায়ে কৌশলের ভূমিকা ছিল অর্থনৈতিক সম্পদসমূহকে সচল করা, যেন সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে কৌশলকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো। ব্যবস্থাপনা স্টাডিজ এর আলাদা শাখা হিসেবে কৌশল (Strategy) আত্মপ্রকাশ করে ১৯৬৫ সালে ,

দুটি বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার একটি হলো- Andrew and Guth কর্তৃক রচিত Business Policy : Text and cose (১৯৬৫) ও অপরটি হলো- Ansoff কর্তৃক রচিত Corporate Strategy (১৯৬৫) । Andrew তাঁর বইতে কৌশল তৈরির মডেল উল্লেখ করেন যা “The basic design model” নামে পরিচিত।

নিচে এ মডেলটি দেওয়া হলো :

 

কৌশল উন্নয়নের পর্যায়

 

পর্যায়-২ (Stage-2) :

১৯৬০ এর শেষ ভাগ হতে ১৯৭০ এর শেষ ভাগ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত ও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। অধিকাংশ উন্নত অর্থনীতির দেশসমূহ সর্বোত্তম প্রযুক্তি ব্যবহার করতে থাকে। পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির শক্তিসমূহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকে। এ সময় মুনাফা অর্জনের জন্য ভোক্তাদেরকে সন্তুষ্ট করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

সবচেয়ে লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে সম্পদসমূহ বিনিয়োগের জন্য কৌশল বিবেচনা করা আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে কৌশল পরিবর্তন হতে থাকে ।

 

পর্যায়-৩ (Stage-3) :

১৯৭০ এর মাঝামাঝি সময় হতে ১৯৮০ এর মাঝামাঝি সময়কে উন্নয়নশীল বিশ্বে তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও ঋণ সংকটের যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ সময়ে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায় এবং প্রবৃদ্ধি কমে যায়। স্ট্যাগফেলশনের সময় সামগ্রিভাবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যায়। যে কোনো পণ্যের বিপরীতে সম্পদ বন্টনের জন্য কৌশল এর প্রয়োজন হয়।

প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা বা মুনাফা অর্জন ও বিনিয়োগ তহবিল সৃষ্টির জন্য কৌশল উন্নয়নের প্রয়োজন ছিল। এ সময় ব্যবসায় ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কৌশলী ব্যবস্থার প্রয়োগ বৃদ্ধি পায়। ১৯৮০ সালের দিকে Micheal Porter কৌশল উন্নয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য তাত্ত্বিকদের চেয়ে বেশি অবদান রাখেন ।

তিনি ১৯৮০ সালে Conmpelilive Strategy নামে একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

পর্যায়-৪ (Stage-4) :

চূড়ান্ত পর্যায়-এ আমরা দেখতে পাই যে, ১৯৮০ সালে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নতুন ও অধিক সংখ্যক জটিল ডাইমেনশন যুক্ত হওয়ায় ব্যবসায়ের উপর চাপ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০ সালে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। কারণ তখন মুদ্রা সংকোচন বেড়ে যায়। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোম্পানির সর্বাধিক উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন- বেসরকারিকরণ, তুলনামূলক অর্থনৈতিক অবস্থা, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও সংরক্ষণশীল নতুন পরিবেশে চাহিদার ক্ষেত্রে সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য কৌশল প্রয়োজন ।

এ সময় হতে ব্যবসায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘কৌশল’ এর সফল প্রয়োগ শুরু হয়। ১৯৯০ সালের দিকে এটি আরো নতুনরূপে আবির্ভূত হয় ৷

 

(ক) বিঘ্নসৃষ্টি:

কৌশল নির্ধারণের সময় প্রচলিত সম্পর্ক বা বর্তমান ব্যয় কাঠামোতে যেন অসহনীয় বিঘ্ন সৃষ্টি না হয় সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া হয়। কারণ, অনেক সময় বিশেষ কৌশলের দ্বারা একটি বিশেষ দিকের উন্নয়ন সাধন করা হলেও অন্যান্য দিকে অসহনীয় মাত্রায় প্রতিকূলতা সৃষ্টি হতে পারে।

 

(খ) প্রণোদনার অপব্যয়:

প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীবৃন্দের আনুগত্য ও পণ্যের প্রতি গ্রাহকদের আকর্ষণ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে কৌশল সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের আনুগত্য বা আকর্ষণ হ্রাস করে, তাকে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেন কর্মীবৃন্দের আনুগত্য হ্রাস তথা প্রণোদনার ক্ষেত্রে অপব্যয় না হয় সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা বাঞ্ছনীয় ।

 

(গ) অন্যান্য কৌশলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি:

কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচ্য কৌশল অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তার মাত্রা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হয়। কোনো বিশেষ কৌশল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বাস্তবায়নে অন্তরায় সৃষ্টি করলে বা বিকল্প কৌশল গ্রহণের পথ রুদ্ধ করলে ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি ও ব্যয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষেত্রে প্রবহমান কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার কৌশল বা ধীরে চলার কৌশল অধিক যুক্তিযুক্ত ।

 

(ঘ) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:

কৌশল গ্রহণের পূর্বে বিবেচ্য কৌশলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি ও মাত্রা বিবেচনা করা বিধেয়। কারণ, বিবেচ্য কৌশলের দ্বারা বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও উক্ত কৌশলের কারণে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তা ব্যবস্থাপনার সার্বিক লক্ষ্যার্জনে প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠান তার পরিকল্পনা বিভাগ, হিসাবরক্ষণ বিভাগ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য প্রযুক্তি আধুনিকায়নের পক্ষে কম্পিউটার সিস্টেম প্রবর্তনের কৌশল গ্রহণ করে পুরাতন কর্মীর স্থলে নতুন দক্ষ কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষম হয়। এতে প্রতিষ্ঠানে প্রভুত মাত্রায় অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হয়।

কিন্তু বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে মূল প্রতিষ্ঠানসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহে উক্ত কৌশলের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসেবে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। এতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এর ফলে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

 

কৌশল উন্নয়নের পর্যায়

 

এতে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক লক্ষ্যার্জনে প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
অবিশ্যক অন্যথায় in পরিশেষে বলা যায় যে, কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা আবশ্যক। অন্যথায়, কার্যকরী কৌশল সফলভাবে নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।

Leave a Comment